বাসস
  ১৫ জুন ২০২৬, ১১:৩৪

রেণু নেই, থমকে যাচ্ছে চিংড়ি চাষ

ফকিরহাটের ফলতিতা ও আশপাশের রেণুর বাজারগুলো এখন প্রায় ক্রেতাশূন্য। ছবি: বাসস

॥ আজাদ রুহুল আমিন ॥

বাগেরহাট, ১৫ জুন, ২০২৬ (বাসস) : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম চিংড়ি উৎপাদন কেন্দ্র বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় এবার দেখা দিয়েছে চিংড়ির রেণুর ভয়াবহ সংকট। ঘেরে রেণু ছাড়ার মৌসুম প্রায় শেষ হতে চললেও চাষিরা চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রেণু সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ফলে হাজার হাজার ঘের প্রস্তুত থাকলেও চিংড়ি চাষ শুরু করা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন খামারিরা।

এক সময় চিংড়ির রেণুর সরবরাহ ও বেচাকেনায় মুখর থাকা ফকিরহাটের ফলতিতা ও আশপাশের রেণুর বাজারগুলো এখন প্রায় ক্রেতাশূন্য। বাজারে নেই পর্যাপ্ত রেণু, আর যা পাওয়া যাচ্ছে তার দামও গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং হ্যাচারির সংখ্যা ও উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চিংড়ী উৎপাদন, স্থানীয় অর্থনীতি, বাজার ব্যবস্থা এবং এই খাত নির্ভর লক্ষাধিক মানুষের জীবিকায়।

উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফকিরহাটে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ৮ হাজার ৪টি ঘের ও ২ হাজার ৬০৮টি পুকুর রয়েছে। এসব জলাশয়ে বছরে প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ বাগদা ও ৭ কোটি ৪৬ লাখ গলদা রেণুর চাহিদা রয়েছে। তবে স্থানীয় চাষী ও ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রকৃত চাহিদা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। চলতি মৌসুমে উপজেলাজুড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি রেণুর প্রয়োজন।

সরেজমিনে উপজেলার নলধা, ঠিকরিপাড়া ও মূলঘর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ চাষী কয়েক মাস আগে ঘের প্রস্তুত করলেও প্রয়োজনীয় রেণু না পাওয়ায় চাষাবাদ শুরু করতে পারেননি। এতে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ঠিকরিপাড়া এলাকার চিংড়ি চাষী দাউদ হায়দার বাবু ফকির বাসস’কে জানান, এক একর ঘের প্রস্তুত করতে তাঁর প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রতিবছর তিনি ওই ঘেরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পোনা ছাড়তেন। কিন্তু এবার মৌসুম শেষ হওয়ার পথে সংগ্রহ করতে পেরেছেন মাত্র ১৮ হাজার পোনা। ঋণ নিয়ে ঘের প্রস্তুত করেও মাছ ছাড়তে না পারায় তিনি চরম উদ্বেগে রয়েছেন।

রেণু ব্যবসায়ী শেখ মনি বাসস’কে বলেন, গত বছর প্রতি হাজার রেণু ১ হাজার ৩শ’ থেকে ১ হাজার ৭শ’ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা ৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। কুমিল্লা ও নোয়াখালীর সরবরাহকারীদের কাছে অগ্রিম দেওয়া প্রায় ৭৮ লাখ টাকাও এখনো ফেরত বা সমন্বয় হয়নি। মৌসুম শেষের পথে, তবুও কাক্সিক্ষত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না।

ফকিরহাট প্রাকৃতিক চিংড়ি পোণা আড়তমালিক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম খোকন বাসস’কে বলেন, স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত রেণু উৎপাদন না হওয়ায় চাষীরা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে আহরিত প্রাকৃতিক রেণু এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে আসা পোনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

উপজেলা মৎস্য চাষী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ফলতিতা বাজারে ৫ শতাধিক মাছের আড়ত রয়েছে। প্রতিদিন সেখানে গড়ে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয় এবং প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক ও পরিবহনকর্মী এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া উপজেলার প্রায় ২০ হাজার বাণিজ্যিক ঘের ও পুকুরকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল।

মৎস্য বিভাগ জানায়, গত অর্থবছরে ফকিরহাটে ২ হাজার ৩১৫ টন চিংড়ি উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৪৩০ টন। তবে রেণু সংকট অব্যাহত থাকলে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম বাসস’কে জানান, ২০১১-১২ সালে দক্ষিণাঞ্চলে ৭৮টি হ্যাচারি থাকলেও মান নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে তা কমে ৩৭টিতে নেমে এসেছে। ফলে রেণু উৎপাদন উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পেয়েছে।

ফকিরহাটের জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু আহরণ ও বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ হওয়ায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হ্যাচারি নির্ভর রেণু উৎপাদন ও চাষ সম্প্রসারণে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তবে বর্তমানে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় মাত্র ৮ শতাংশ হওয়ায় সংকট কাটাতে সময় লাগবে।

চাষীদের আশঙ্কা, দ্রুত রেণু সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শুধু উৎপাদন নয়, দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রধান রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্পও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।