শিরোনাম

ঢাকা, ১৩ জুন, ২০২৬ (বাসস) : উচ্চশিক্ষিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ‘মেধা পাচার’ (ব্রেইন ড্রেন) চ্যালেঞ্জকে ‘মেধা আবর্তন’ (ব্রেইন সার্কুলেশন)-এ রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে এই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো- বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি পেশাজীবী ও শিক্ষাবিদদের মেধা, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং উদ্ভাবনী ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা।
এই পরিকল্পনার আওতায় সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ক্রেডিট ট্রান্সফার পদ্ধতি, শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি, সামার স্কুল, ভিজিটিং স্কলার স্কিম এবং যৌথ গবেষণা উদ্যোগ চালু করবে। এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের দেশ না ছেড়েই বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা এবং পেশাদার নেটওয়ার্কের সরাসরি সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ঐতিহাসিক জাতীয় বাজেট পেশ করার সময় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মেধা পাচারকে মেধা আবর্তনে রূপান্তর করতে কাজ করছি।’ তিনি প্রবাসী বাংলাদেশি ও স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরও দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
বাজেট বক্তৃতায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতি নতুন করে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। একইসাথে বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধানের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলার লক্ষ্যে দেশীয় গবেষণা কার্যক্রমে সরকারের পক্ষ থেকে আরও বেশি সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিকীকরণ প্রচেষ্টার পাশাপাশি, সরকার দেশের বিভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থাকে সমন্বিত করার পাশাপাশি যোগ্যতার সমমান মানদণ্ডের বাস্তবায়ন জোরদার করার পরিকল্পনা করছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা থেকে শুরু করে মাদ্রাসা, কারিগরি, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সকল স্তরে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে- শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সহনশীলতা, পরিবেশগত সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ে জ্ঞানসম্পন্ন ও বিশ্বমানের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
বাজেটে মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার এবং উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা বাড়াতে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একই সাথে ডিজিটাল লার্নিং টুলস এবং আধুনিক শিক্ষাসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শিক্ষকদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকার তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি, পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ এবং উন্নত কল্যাণমূলক ব্যবস্থার পরিকল্পনা ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত প্রণোদনা দেওয়া হবে।
যুব উন্নয়নকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আজকের শিশু ও তরুণরাই দেশের আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির মূল শক্তি। কোনো পারিপার্শ্বিক সীমাবদ্ধতার কারণে যেন প্রতিভা বিকশিত হতে বাধা না পায়, তেমন একটি পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায়, যারা কেবল নিজেদের ভবিষ্যৎই গড়বে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, উদ্ভাবন বাড়াবে এবং সামাজিক পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেবে।
যুব-নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক রূপান্তর ও জাতীয় অগ্রগতির রূপরেখা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা যে প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, তারা সুযোগের জন্য অপেক্ষা করবে না। বরং নিজেরাই সুযোগ সৃষ্টি করবে।’
শিক্ষা খাতে বরাদ্দের বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আগামী অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ২ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন, যার মোট পরিমাণ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। এর আগে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।