শিরোনাম

\ মোশতাক আহমেদ \
ঢাকা, ২৩ মে, ২০২৬ (বাসস): দীর্ঘদিনের দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অব্যবস্থাপনায় দেশের অসংখ্য খাল ও জলাধার হারিয়েছে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ। এর প্রভাব পড়েছে নদীর নাব্যতায়, কৃষিতে, মৎস্যসম্পদে এবং জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিতে।
তবে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। বর্তমান সরকারের খাল খনন কর্মসূচির ফলে ফিরছে নদীর প্রাণ। জেগে উঠছে দুইপাড়ের সবুজ উপকূল।
জাতীয় নদী দিবসকে সামনে রেখে এখন দেশব্যাপী নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাল পুনরুদ্ধার ছাড়া নদী রক্ষা সম্ভব নয়। কারণ নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোই মূলত পানিপ্রবাহের শাখা-উপশাখা হিসেবে কাজ করে।
ফলে সরকারের খাল খনন কর্মসূচির কারণে দেশের নদীগুলোতে আবারও প্রাণ ফিরে আসবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে মোট ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সম্প্রতি জানিয়েছেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই বিশাল কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ একাধিক সংস্থা যৌথভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসন।
সরকারি হিসাবে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাবিখা, কাবিটা ও টিআর কর্মসূচির আওতায় আরও প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল সংস্কার ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় পর্যায়ে নদী-খাল-জলাধার খনন কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় চলতি বছরের মার্চ মাসে। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলো ভরাট হয়ে গেলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হয়।
এতে নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যায়। আবার বর্ষাকালে পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।
খাল পুনঃখননের মাধ্যমে যখন পানির চলাচল স্বাভাবিক হয়, তখন নদীর প্রবাহও সচল হয়। এতে নদীতে জমে থাকা পলি ধীরে ধীরে সরে যায় এবং নাব্যতা ফিরে আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘নদীর প্রাণ’ বলতে মূলত তার প্রবাহক্ষমতা, জীববৈচিত্র্য, নাব্যতা এবং পানি ধারণক্ষমতাকে বোঝায়।
একটি নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও জলাধারগুলো সচল থাকলে নদীতে পানির আদান-প্রদান বাড়ে, মাছের প্রজনন বৃদ্ধি পায়, কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়ে এবং জলাবদ্ধতা কমে। ফলে নদী আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, দেশের বহু নদীর সঙ্গে সংযুক্ত প্রাচীন খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীগুলো শুকিয়ে পড়ছে।
খাল পুনঃখননের মাধ্যমে সেই প্রাকৃতিক সংযোগ পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, কর্মসূচির আওতায় খাল খননের পাশাপাশি খালপাড় সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার কাজও করা হচ্ছে। বিভিন্ন জেলার প্রশাসনকে এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র জারি করে ব্যক্তি উদ্যোগেও সরকারি খাল খনন ও পুনঃখননে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছে। ওই পরিপত্রে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে দখল ও ভরাটের কারণে বহু খাল নাব্যতা হারিয়েছে।
এজন্য স্থানীয় জনগণ ও ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় নদী দিবস উপলক্ষে নদী ও খাল রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ নদী পরিচ্ছন্নতা অভিযান, আলোচনা সভা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও খাল পুনঃখননকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল সচল হলে সেচব্যবস্থা সহজ হয়, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমে এবং মাছ উৎপাদন বাড়ে।
বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় খাল পুনঃখননের ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনেও খাল পুনঃখনন বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে খাল দখল ও ভরাটের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে নগরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে বলে তারা মনে করেন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, শুধু খনন করলেই হবে না, খালকে পুনরায় দখল ও ভরাটমুক্ত রাখতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে খাল খননের পরও কয়েক বছরের মধ্যে আবার দখল হয়ে যায়।
এদিকে সরকারের সমন্বিত খাল পুনঃখনন কর্মসূচির জন্য পৃথকভাবে একক বাজেট ঘোষণা না করা হলেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রকল্পের আওতায় পর্যায়ক্রমে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, এলজিইডি, বিএডিসি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেট থেকেই এসব কাজ পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও পরিবেশের অবহেলার কারণে নদী-খাল ব্যবস্থা মারাত্মক সংকটে পড়েছে।
তাই জাতীয় নদী দিবসে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, নদী ও খালকে একটি সমন্বিত জলব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এ বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মকসুমুল হাকিম চৌধুরী বাসসকে বলেন, ‘নদীকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। একটি নদীর সঙ্গে অসংখ্য খাল, বিল ও জলাধার যুক্ত থাকে।’
তিনি বলেন, এসব খাল ভরাট বা দখল হয়ে গেলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হয়, পলি জমে নাব্যতা কমে যায় এবং ধীরে ধীরে নদী মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। তাই খাল পুনঃখনন আসলে নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনারই একটি কার্যকর উদ্যোগ।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার বর্তমানে যে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, তা শুধু জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য নয়, এটি নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, ‘খাল সচল হলে নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ে, মাছের আবাসস্থল পুনরুদ্ধার হয়, কৃষিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পায় এবং জীববৈচিত্র্যও ফিরে আসে।’