শিরোনাম

\ হাবিবুর রহমান \
ঢাকা, ২৩ মে, ২০২৬ (বাসস) : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল, সেই লক্ষ্য অর্জনে এখনো নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও প্রসিকিউশন; উভয় পক্ষই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। আসামিপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আইনে যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, এখানে তারা তা পাচ্ছে। একইভাবে ভিকটিম পরিবারগুলোর বক্তব্য, অভিযোগ, প্রমাণ ও সাক্ষ্য সংগ্রহেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যারা আহত, নিহত, গুম বা খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতিটি পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা রয়েছে।
তিনি জানান, আন্দোলনের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত থাকায় পরিবারগুলোর শোক তিনি গভীরভাবে অনুভব করেন।
তিনি বলেন, ‘জুলাই শহীদ পরিবারগুলো যেভাবে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করে, আমিও একইভাবে সেই প্রত্যাশা করি। প্রতিটি মামলায় শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা কঠোর পরিশ্রম করছি। স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ আমরা সম্পন্ন করেছি।’
চিফ প্রসিকিউটর জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায়ও রয়েছে। এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে একটি মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে আরও ২২টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় প্রতিদিন সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তি উপস্থাপন ও নথি পর্যালোচনার কাজ চলছে। পাশাপাশি ৩১টি মামলার তদন্ত চলছে। এসব মামলায় ব্যাপক নথি, প্রমাণ, সাক্ষ্য ও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত অভিযোগ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে ১০৫টি মামলা। এছাড়া আরও প্রায় ৪৫০টি অভিযোগ প্রসিকিউশনের কাছে জমা রয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে সেগুলো তদন্তে পাঠানো হবে।
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রতিটি মামলাই চ্যালেঞ্জিং। কারণ জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে জড়িত অনেকেই সমাজে প্রভাবশালী। পুলিশ, প্রশাসন, রাজনীতি ও সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন পেশার উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ সবসময় সহজ হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আমরা তদন্ত থেকে বিচার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ এগিয়ে নিচ্ছি।’
কিছু শহীদ পরিবার মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য পাচ্ছেন না- এমন অভিযোগের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন এলাকায় গণশুনানির আয়োজন করছেন, যাতে পরিবারগুলো সরাসরি প্রসিকিউশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমি চেষ্টা করছি, প্রতিটি পরিবার যেন তাদের মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারে এবং প্রয়োজনীয় নথি বা তথ্য আমাদের দিতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কেউ হতাশা প্রকাশ করেনি বা বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা জানায়নি।’
চিফ প্রসিকিউটর জানান, দুটি ট্রাইব্যুনালেই প্রতিদিন নিয়মিত বিচারকাজ চলছে। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিনই আদালত বসছে। বর্তমানে প্রসিকিউশনে প্রায় ১৯ জন প্রসিকিউটর ও ২৪ জন তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করছেন।
তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, নথি সংগ্রহ, ফরেনসিক তথ্য বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, ‘এত বিপুল সংখ্যক মামলাকে কাঠামোগতভাবে এগিয়ে নেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও আমরা স্বাভাবিক গতিতেই মামলা নিষ্পত্তির কাজ এগিয়ে নিচ্ছি।’
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ‘বিচার দ্রুত করলে অবিচারের আশঙ্কা থাকে। আবার অযথা দেরি হলে ভিকটিম পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। তাই আমরা তাড়াহুড়োও করছি না, আবার অকারণে বিলম্বও করছি না। নিয়মিত, ধারাবাহিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রতিটি মামলার বিচার চলছে।’
তিনি জানান, মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় ট্রাইব্যুনালকে সুসংগঠিতভাবে কাজ করতে হচ্ছে। প্রতিটি মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই, ফরেনসিক রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবৃতি ও নথিপত্রসহ সবকিছু ব্যাপকভাবে পর্যালোচনার পরই সেগুলো আদালতে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। আসামিপক্ষ যাতে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারে, সে জন্য আদালত অত্যন্ত উন্মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে ভিকটিম পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়াটাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
চিফ প্রসিকিউটর জানান, তদন্ত পর্যায়ে নানা কারণে অনেক পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে গণশুনানি, সরাসরি সাক্ষাৎ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় প্রসিকিউশন অনেক ভিকটিম পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছে।
তিনি বলেন, ‘জুলাই শহীদদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। তারা গণতন্ত্র রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছেন। তাদের পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে প্রতিটি মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় এবং বিচার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাগুলোর বিচার স্বাভাবিক গতিতে এগোলে শিগগিরই একটি বড় অংশ নিষ্পত্তি সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।’
তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদি হলেও তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব অপরাধ দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত।
তিনি বলেন, ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। একদিকে আসামির অধিকার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বিচার নিশ্চিত করা- এই দুইয়ের সমন্বয় করেই আমরা কাজ করছি।
দেশের মানুষ ন্যায়বিচার চায়, আমরাও সেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’