শিরোনাম

॥ দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ ॥
কুমিল্লা, ১৩ মে, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির প্রসঙ্গ এলেই যে নামটি সবার আগে উচ্চারিত হয়, তা কুমিল্লার রসমালাই।
দুধ, ক্ষীর ও ছানার অনন্য সমন্বয়ে তৈরি এই মিষ্টান্ন কেবল একটি খাবার নয়, বরং এটি কুমিল্লার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বাঙালির রসনাবিলাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রায় এক শতাব্দীর ঐতিহ্য বহনকারী কুমিল্লার রসমালাই এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি পেয়েছে।
তবে খ্যাতির পাশাপাশি বাড়ছে নকলের বিস্তার, ভেজাল উৎপাদন ও মানহীন বিপণন। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টির স্বকীয়তা রক্ষায় এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
গবেষক ও স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কুমিল্লার রসমালাইয়ের ইতিহাস মূলত ঘোষ সম্প্রদায়ের দুধ-ভিত্তিক ক্ষীরভোগ সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। প্রায় শতবর্ষ আগে কুমিল্লা নগরীর মনোহরপুর এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘মাতৃভান্ডার’ থেকেই আধুনিক রসমালাইয়ের যাত্রা শুরু হয়।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৩০ সালের দিকে খনিন্দ্র সেন ও মনিন্দ্র সেন নামের দুই ভাই কিংবা ফণীন্দ্র সেন নামের এক মিষ্টি ব্যবসায়ী এই উদ্যোগ শুরু করেন। স্থানীয় জমিদার ইন্দুভূষণ দত্ত ব্যবসা পরিচালনার জন্য জায়গা বরাদ্দ দিয়েছিলেন বলেও লোকমুখে শোনা যায়।
তৎকালে ঘোষদের ঘরে ঘরে ক্ষীরভোগ তৈরি হতো। সেই ক্ষীরের সঙ্গে ছানা ও সামান্য ময়দা মিশিয়ে ছোট গোলা তৈরি করে ঘন দুধের মধ্যে ডুবিয়ে নতুন স্বাদের যে মিষ্টি তৈরি হয়, সেটিই পরবর্তীতে রসমালাই নামে পরিচিতি পায়। ধীরে ধীরে এর স্বাদ ও গুণগত মান মানুষের মন জয় করে নেয়।
১৯৫০ সালের পর কুমিল্লা মিষ্টি ভান্ডার, ভগবতী পেড়া ভান্ডার ও শীতল ভান্ডারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও কুমিল্লার মিষ্টান্ন ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে। তবে রসমালাইয়ের ক্ষেত্রে মাতৃভান্ডারের নামই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার আগ থেকেই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ও অতিথি আপ্যায়নে কুমিল্লার রসমালাই বিশেষ স্থান দখল করে নেয়। বঙ্গভবন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান এবং বিদেশি অতিথি আপ্যায়নে এই মিষ্টির ব্যবহার ছিল নিয়মিত। পোড়াবাড়ির চমচম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা কিংবা বগুড়ার দইয়ের মতো কুমিল্লার রসমালাইও হয়ে ওঠে বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য।
রসমালাইয়ের স্বকীয়তার মূল রহস্য এর প্রস্তুত প্রণালিতে। গরুর দুধ দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় ঘন ক্ষীর। এরপর তাতে ছানা ও অল্প পরিমাণ ময়দা দিয়ে তৈরি ছোট গোলা ডুবিয়ে রাখা হয়। ঐতিহ্যবাহী নিয়মে এক মণ দুধ থেকে সর্বোচ্চ ১৩ থেকে ১৪ কেজি রসমালাই উৎপাদন করা সম্ভব।
মাতৃভান্ডারের ব্যবস্থাপক তমাল সাহা বলেন, আমরা এখনো পুরনো ঐতিহ্য ও মান ধরে রেখে রসমালাই তৈরি করছি। এখানে প্রতিদিন সীমিত পরিমাণ উৎপাদন হয়। একসঙ্গে অতিরিক্ত পরিমাণ বিক্রি করা হয় না। ব্যবসায়িক সততা ও গুণগত মান বজায় রাখার কারণেই ক্রেতাদের আস্থা এখনো অটুট রয়েছে।
তিনি জানান, বাজারে মাতৃভান্ডারের নাম ব্যবহার করে যেসব রসমালাই বিক্রি হয়, তার অধিকাংশই নকল। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার আলেখারচর এলাকায় এখন ‘আদি মাতৃভান্ডার’, ‘নিউ মাতৃভান্ডার’, ‘প্রসিদ্ধ মাতৃভান্ডার’সহ নানা নামে ডজনখানেক দোকান গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, পুরো মহাসড়কজুড়ে এমন দোকানের সংখ্যা শতাধিক।
এসব দোকানে কম দামে রসমালাই বিক্রি হলেও অনেক ক্ষেত্রেই মান বজায় রাখা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
আসল রসমালাই তৈরিতে যেখানে বিপুল পরিমাণ দুধ প্রয়োজন হয়, সেখানে ভেজালকারীরা পাউডার দুধ, অতিরিক্ত ময়দা ও কৃত্রিম উপাদান ব্যবহার করে কম খরচে বেশি পরিমাণ উৎপাদন করছে। এতে স্বাদ ও গুণগত মান দুটোই নষ্ট হচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর থেকে কুমিল্লায় ঘুরতে আসা পর্যটক মিজানুর রহমান বলেন, কুমিল্লায় এসে রসমালাই না খেলে ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আসল রসমালাইয়ের স্বাদ একেবারেই আলাদা।
চট্টগ্রাম থেকে আসা ব্যবসায়ী রাশেদুল ইসলাম বলেন, অনেক জায়গায় রসমালাই খেয়েছি, কিন্তু কুমিল্লার রসমালাইয়ের মতো স্বাদ অন্য কোথাও পাইনি। তবে, নকল দোকানের কারণে আসল দোকান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে কুমিল্লায় বেড়াতে আসা নুসরাত জাহান বলেন, আসল রসমালাইয়ের স্বাদ খুবই সমৃদ্ধ ও দুধের ঘ্রাণে ভরপুর। কিন্তু এখন বাজারে অনেক নকল পণ্য পাওয়া যায়, যেগুলোর স্বাদ একেবারেই আলাদা।
ঐতিহ্য কুমিল্লার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, রসমালাই শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। এর স্বকীয়তা রক্ষা করা জরুরি। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যমে কুমিল্লার রসমালাই আন্তর্জাতিকভাবে নতুন পরিচিতি পেয়েছে। এখন প্রয়োজন এই ঐতিহ্যের যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, আসল ও নকলের পার্থক্য নির্ধারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে ভেজাল প্রতিরোধে নিয়মিত তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।
কুমিল্লার রসমালাই ইতোমধ্যে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্যের অবস্থান আরো শক্তিশালী করবে।
লাভ ফর বাংলাদেশ ট্যুরিজম ক্লাবের সভাপতি মীর মফিজুল ইসলাম বলেন, কুমিল্লার রসমালাই শুধু স্থানীয় ঐতিহ্য নয়, এটি বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সঠিক ব্র্যান্ডিং ও আন্তর্জাতিক বিপণন করা গেলে এটি বৈদেশিক বাজারেও বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তিনি আরো বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও কুমিল্লার রসমালাইয়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অনেকে বিদেশে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় এটি ব্র্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করছেন।