বাসস
  ১২ জুন ২০২৬, ১২:৫৫

রেলপথে মধ্যপাড়ার পাথর পরিবহন সচল করতে ১৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ

ছবি: বাসস

রোস্তম আলী মন্ডল

দিনাজপুর, ১২ জুন, ২০২৬ (বাসস): দিনাজপুর মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির পাথর রেলপথে পরিবহন সচল করতে সংস্কার কাজে সরকারিভাবে ১৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দিনাজপুর পার্বতীপুর রেলওয়ে বিভাগের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আবু জাফর মো. রাকিব হাসান এ তথ্য বাসসকে নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, সম্প্রতি বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এমপির নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদের আরও দু'জন মন্ত্রী দিনাজপুর মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির উত্তোলিত মজুত পাথর নিয়ে খনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন।

আলোচনায় সিদ্ধান্ত, বিক্রিত পাথর রেলপথে পরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী (সিএমই) মো. আমিনুল হাসান জানান, এই রেলপথ সংস্কারের জন্য খনি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে।

দ্রুত সময়ের মধ্যে বরাদ্দকৃত ১৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলপথ সংস্কারের কাজ শুরু হবে। এজন্য খুব শিগগিরই দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে, রেলপথটি মজবুত ও টেকসই পদ্ধতিতে সংস্কার মাধ্যমে চালু করার ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, রেলপথটি চালু হলে স্বল্প খরচের মাধ্যমে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির পাথর দেশের উন্নয়ন কাজে ব্যবহারের জন্য ক্রেতারা পরিবহন করতে পারবেন। 

সরকার এ ধরনের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এই খনির পাথর মজুতের স্তুপ কমিয়ে পাথর খনিটির উন্নয়ন অগ্রগতি করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গৃহীত সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত বাস্তবায়ন হবে বলে সূত্রটি আশ্বস্ত করেন।

রেলওয়ে পশ্চিম বিভাগের পাকশি জোন রেলওয়ে বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এফ এম মাসউদ-উর রহমান বাসসকে জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে এই রেলপথটি বন্ধ থাকার পর আবার রেলপথ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশন রুটে ভবানীপুর থেকে মধ্যপাড়া পাথর খনি পর্যন্ত রেলপথ সংস্কারের জন্য প্রায় ১৩৪ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা ওই রেলপথটি সংস্কার করতে পরিদর্শন করেছি।

সেই সঙ্গে সংস্কার কাজে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং কার্যক্রম শুরু করেছি বলে তিনি ব্যক্ত করেন।

সূত্রটি জানায়, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এই খনির পাথর রেলপথে পরিবহন করার কথা থাকলেও বাধ্য হয়ে সড়ক পথে পরিবহন করা হচ্ছে। 

এতে পরিবহন খরচ দ্বিগুণ পড়ছে। ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে পাথর বিক্রি কমে গেছে। ফলে খনি কর্তৃপক্ষ আর্থিক সংকটে পড়ছে।

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমজাদ হোসেন বাসসকে জানান, রেলপথ বন্ধ থাকায় সড়ক পথে পাথর পরিবহন খাতে আর্থিক অপচয় হচ্ছে। 

রেলপথে পাথর পরিবহনে মধ্যপাড়া-ঢাকা পর্যন্ত প্রতি টনে খরচ হয় মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। অথচ সম পরিমাণ পাথর মধ্যপাড়া-ভৈরব-ঢাকা সড়ক পথে পরিবহনে প্রতি টনে খরচ হয় ১৬০০-১৭০০ টাকা।

মধ্যপাড়া পাথর খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) অধীন মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের খনিটি ১৯৭৩-৭৪ সালে আবিষ্কার হয়।

এরপর প্রায় শতাধিক কোটি টাকা ব্যয়ে মধ্যপাড়া খনি পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ শেষে গত ২০০৯ থেকে রেলপথে পাথর পরিবহন শুরু হয়। কিন্তু ২০১১ সালে পার্বতীপুর উপজেলার ভবানীপুর রেলস্টেশন থেকে মধ্যপাড়া খনি পর্যন্ত রেলপথের বেশ কয়েকটি স্থানে ৭০টি স্লিপার (পাটাতন) চুরি হয়ে যায়। এরপর থেকে বন্ধ হয়ে যায় ওই রেলপথে পাথরবাহী ওয়াগনের চলাচল।

এরপর আর রেলপথটি চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এর মধ্যে অকেজো হয়ে পড়েছে ‘পাথর পরিমাপ স্কেল’। রেলপথে অবকাঠামো ও রেল লাইন সংলগ্ন জমি বে-দখল হয়ে গেছে। চুরি হয়ে গেছে প্রায় ৫ কিলোমিটার রেললাইন।

এ বিষয়ে পার্বতীপুর রেলওয়ে থানায় ১১টি মামলা চলমান রয়েছে।

সূত্রটি জানায়, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, খনির ৮০ ভাগ পাথর রেলপথে পরিবহন করতে হবে। কিন্তু কিছুতেই ওই নির্দেশনা কাজে আসছে না।

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের মহা-ব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও সেবা) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম রিটু বাসসকে জানান, মধ্যপাড়া পাথর খনির ১২ ইয়ার্ডে ৪২৭ কোটি টাকার ১৪ লাখ ৬৭ হাজার টন পাথরের মজুত গড়ে উঠেছে। এই দুই সাইজের পাথর বিক্রি কমে যাওয়ায় অর্থ সংকটে পড়েছে খনি কর্তৃপক্ষ। 

বর্তমানে নদী শাসনের জন্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকার বোল্ডার ৩ লাখ ৯০ হাজার টন পাথর এবং রেলপথের জন্য ২৫০ কোটি টাকার ব্লাস্ট ৯ লাখ ৫০ হাজার টন পাথর ছাড়াও আরও ১০০ কোটির টাকার পাথর মজুত রয়েছে। 

মধ্যপাড়া-ভবানীপুর রেলপথটি খুব শিগগিরই চালু হলে পাথর পরিবহনে খনির ব্যাপক অর্থ সাশ্রয় হবে।

পাথর খনির বিপণন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রায়হান কবির বাসসকে জানায়, দেশে পাথরের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ টন। 

এ চাহিদার সিংহভাগ আমদানি করা হয় দুবাই, ভিয়েতনাম, ভারত ও ভুটান থেকে। সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব। অথচ রেলপথে তা পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর বড় অঙ্কের টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে।

পাথর কেনা-বেচার অনুমোদিত ডিলার মো. জালাল উদ্দীন জানান, খনির নির্ধারিত ১৬৫ জন ডিলারের মাধ্যমে পাথর বিক্রি করা হয়। 

এই খনির পাথর সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয় না। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে খনির পাথরে। 

তিনি বলেন, সরকারি মেগা প্রজেক্টগুলো নির্মাণ কাজ চালু হলে এই পাথর সবই কাজে লাগবে বলে তিনি মনে করেছেন।