বাসস
  ১১ জুন ২০২৬, ১৪:১৩
আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ১৪:৫১

ভোলার গ্যাস সম্পদ নিয়ে তারেক রহমানের মাস্টারপ্ল্যান; পাল্টে যাবে দৃশ্যপট

ছবি: বাসস

আল-আমিন শাহরিয়ার

ভোলা, ১১ জুন, ২০২৬ (বাসস) : জেলায় প্রাপ্ত খনিজ গ্যাস সম্পদকে কাজে লাগাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘মাস্টারপ্লান’ হাতে নিয়েছেন। এই বিশাল গ্যাসভান্ডার নিয়ে বিগত সরকারের বিশৃঙ্খল চিন্তাধারাকে বাদ দিয়ে নতুনভাবে উন্নয়ন কর্ম শুরু করার একগুচ্ছ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এতে রয়েছে-সার কারখানা, বিদ্যুৎ প্লান্ট, কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়, ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ কেন্দ্র, গ্যাসভিত্তিক শিল্প কারখানা স্থাপনসহ একটি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপ দিয়ে ভোলাসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলকে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সমৃদ্ধ করা। 

গত ৩ মে থেকে ৬ মে ঢাকায় জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভোলার গ্যাস সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বাস্তবসম্মত উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেন। ওই সম্মেলনে ভোলার গ্যাস ব্যবহারের বিষয়টি প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে, ভোলার গ্যাস বাইরে স্থানান্তর বা জাতীয় গ্রিডে নেয়ার পরিবর্তে ভোলাতেই ব্যবহার করা হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দ্বীপ জেলা ভোলাসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে পরিকল্পিত শিল্প-কলকারখানা ও সার কারখানাসহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা।

এদিকে ভোলার খনিজ গ্যাস নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা বললেন তথ্য মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও। গত শুক্রবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাসকে কেন্দ্র করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলা সম্ভব।
তিনি বলেছেন, ‘যেকোনো বড় বিনিয়োগের প্রথম শর্তই হলো জ্বালানি অবকাঠামো ও নিরাপত্তা। দক্ষিণাঞ্চলে জ্বালানি সম্পদ বিদ্যমান থাকায় এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে।’ 

দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তথ্য মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ভোলায় যে গ্যাস আছে, এই গ্যাসকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলে আমরা নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপনের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করতে পারি। বিনিয়োগকারীরা যেকোনো অঞ্চলে বিনিয়োগ করার আগে মূলত: দু’টি জিনিস চায়-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা। যেহেতু দক্ষিণ বাংলায় এই জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, তাই একে পরিকল্পিতভাবে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের কাজে লাগাতে হবে।’

মন্ত্রী বলেন, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত উন্নয়ন ইস্যুগুলো কেবল রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতাসীনদের এজেন্ডা হওয়া উচিত নয়। উন্নয়ন বিশ্লেষকগণ মনে করছেন, ভোলার গ্যাস সম্পদ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মুক্ত চিন্তাভাবনা বাস্তবায়ন হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর দৃশ্যপট পাল্টে যাবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্সে) এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুত আছে। এর পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। ১৯৯৫ সালে ভোলায় প্রথম শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। সেখান থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয় ২০০৯ সালে। ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে আবিষ্কৃত ইলিশা কুপ থেকে এখনো গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়নি।

জেলা শহরতলীর দক্ষিণ চরপাতা গ্রামে তিন বছরপূর্বে গ্যাসক্ষেত্র খুঁজে পায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। ওই ইলিশা গ্যাসক্ষেত্রটি ইতোমধ্যেই গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এখনো উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না। কারণ, ভোলায় বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে।

শিল্পকারখানা স্থাপনে দেশি কোম্পানি 

ভোলার গ্যাস সম্পদে লাভবান হতে দেশের শীর্ষ শিল্প কারখানাগুলো ইতোমধ্যেই এখানে বিনিয়োগ শুরু করেছে। গত কয়েক বছরে জেলা সদরে জমি অধিগ্রহণ করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলেছে, শেলটেক, কাজী গ্রুপ, উর্মি গ্রুপ ও আর এফ এল কোম্পানিসহ ছোট বড় মিলিয়ে কমপক্ষে ডজনখানেক কোম্পানি। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব কোম্পানিগুলোতে জেলা ও অন্যজেলার কমপক্ষে আড়াই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। জেলায় শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে আরো অর্ধশত কোম্পানি জমি অধিগ্রহণ করেছে।

ভোলায় ঝুৃৃঁকছে বিদেশিরা 

গত বছরের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, গ্যাস সমৃদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা ভোলায় প্রায় ১শ’ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগে হতে যাচ্ছে। এতে ভোলায় নতুন একটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে। চীনা বিনিয়োগে নির্মিত এ অঞ্চলে মৎস্য ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন এবং কৃষি-শিল্পভিত্তিক বিভিন্নকারখানা স্থাপিত হবে। নতুন এই অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিপূর্ণভাবে চালু হলে তাতে কর্মসংস্থান হবে প্রায় এক লাখ লোকের।

‘ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক জোন’ নামের এই অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করবে চীনা ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ। বেসরকারি এই অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে ইতোমধ্যে প্রাথমিক অনুমোদন বা প্রি-কোয়ালিফিকেশন লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। গত বছরের ২৫ আগস্ট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছিল সংস্থাটি।

বেজা সূত্রে জানা গেছে, ভোলা সদর উপজেলায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০২ দশমিক ৪৬ একর জমিতে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে। পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে ১৫৮ একর করা হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে বিভিন্ন খাতের প্রায় ৪০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হবে।

প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়ার পর এখন বেশ কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে হবে ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক জোনকে। এরপর সেখানে বিনিয়োগকারীরা শিল্পকারখানা স্থাপন করতে পারবেন। এ পর্যন্ত মোট ১৩টি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে বেজা।

সংস্থাটি জানায়, নতুন এই অঞ্চলকে একটি পরিবেশবান্ধব, শ্রমঘন ও কৃষিভিত্তিক শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ ইতোমধ্যে পোশাকবস্ত্রসহ বাংলাদেশে বেশ কিছু খাতে বিনিয়োগ করেছে।

ওই সময়ে বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক জোন বরিশাল বিভাগের প্রথম অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অঞ্চলটি মৎস্য ও কৃষিজ সম্পদভিত্তিক শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক জোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঝুয়াং লাইফেং বলেন, চীনা বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যে এখানে বিনিয়োগে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। ভোলার গ্যাস ও কৃষিসম্পদের সুবিধা কাজে লাগিয়ে এখানে বিদেশি বিনিয়োগ আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জেলার নীতিনির্ধারকগণ যা বলছেন 

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিষ্টার আন্দালিব রহমান পার্থ’র সাথে।

তিনি বাসস’কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও দিক নির্দেশনায় ভোলায় প্রাপ্ত গ্যাস সম্পদকে কাজে লাগিয়ে আগামীর দক্ষিণাঞ্চলে উন্নয়নের বিপ্লব ঘটানো হবে। পাশাপাশি উপকূলীয় ভোলা হবে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় অর্থনৈতিক অঞ্চলের এক অনন্য রোল মডেল।

এ বিষয়ে ভোলার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনে কিংবা গাড়িতে করে নেয়া অনেক ব্যয়বহুল। কিন্তু এখানেই শিল্পকারখানা গড়লে গ্যাস কম খরচে ব্যবহার করা যাবে। উৎপাদিত পণ্য ভোলার পাশেই নদীপথে পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরে নেয়া যাবে। 

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝামেলামুক্ত পরিবেশে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এতে ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বেকারত্ব দূর হবে।

এ বিষয়ে ভোলার জেলা প্রশাসক ডা.শামীম রহমান বাসস’কে বলেন, সম্প্রতি শেষ হওয়া ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ভোলার গ্যাস ভোলায় ব্যবহার করে যদি ভোলাতেই শিল্পকারখানা ও সার কারখানা গড়ে তোলা যায়, তাহলে ব্যবসায়ীরা সহজেই পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরে উৎপাদিত পণ্য পৌঁছাতে পারবেন। ভোলাতে পর্যাপ্ত জমি আছে। এখানে শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে অবহেলিত ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বেকারত্ব দূর হবে। ‘সম্পদশালী হিসেবে এ জেলা উন্নয়ন সূচকে আরো কয়েকধাপ উচ্চতায় পৌঁছবে।