বাসস
  ১১ জুন ২০২৬, ১৬:৩৪

চিকিৎসক ও জনবল সংকটে খুঁড়িয়ে চলছে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল

ছবি : বাসস

মোশারফ হোসেন

রাজবাড়ী, ১১ জুন, বাসস (২০২৬) : জেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট রাজবাড়ী সদর হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক ও জনবল সংকটে খুঁড়িয়ে চলছে। 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বিশেষ করে মেডিসিন, কার্ডিওলজি, সার্জারি, শিশু, গাইনী, চর্ম ও যৌন, ফরেনসিক মেডিসিন, অর্থ সার্জারি, ইএনটি, এনেসথেসিয়া, জুনিয়র বিশেষজ্ঞ, মেডিকেল অফিসার, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ও রেডিওলজিস্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য থাকায় জেলার লাখো মানুষ কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫৭ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের বিপরীতে অধিকাংশ চিকিৎসক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে জনবল সংকট রয়েছে। জুনিয়র বিশেষজ্ঞ, মেডিকেল অফিসার, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ও রেডিওলজিস্ট পদেও একই চিত্র।

বর্তমানে এসব গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটাগরিতে সম্প্রতি মাত্র ১৬ জন মেডিকেল অফিসার পদায়ন করা হয়েছে বলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুল হান্নান জানিয়েছেন। তবে এখনো কোন চিকিৎসক কাজে যোগ দান করেন নাই। ফলে পূর্বের হাতে গোনা কয়েকজন চিকিৎসককে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শত শত রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে সদর হাসপাতালে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগীকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে জটিল রোগের রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে ফরিদপুর, ঢাকা কিংবা অন্যান্য বড় হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে।

শুধু চিকিৎসক সংকটই নয়, হাসপাতালটিতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরও ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ওয়ার্ড বয়, আয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং নাইট গার্ডের একাধিক পদ শূন্য থাকায় হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের একজন ইমদাদুল হক জানান, শিশু ওয়ার্ডে কীভাবে শিশু ও শিশুর মাকে রেখে বাড়িতে যাব? আকলিমা (৬৮) জানান, ৭ দিন ধরে আসছি, আমার ছেলে সুস্থ হয়নি। ডায়রিয়া ওয়ার্ড, শিশু ওয়াডসহ গাইনী ওয়ার্ডের চিত্র আরো খারাপ।

আউটডোরে, দাঁতের রোগীরা সব চিকিৎসা এখানে পাননা, চক্ষু রোগী, চর্ম ও যৌন রোগীরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও অনেক সময় কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। একজন চিকিৎসককে একসঙ্গে অনেক রোগী দেখতে হয়, যে কারণে সেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজবাড়ী জেলার প্রায় ১২ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা সদর হাসপাতাল। অথচ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো বছরের পর বছর পদ শূন্য থাকায় হাসপাতালের সক্ষমতা অনুযায়ী সেবা প্রদান সম্ভব হচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, কৃষক, শ্রমিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।

সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসপাতালের শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলে জেলার স্বাস্থ্যসেবার মান অনেকাংশে উন্নত হবে। অন্যথায় জনসংখ্যার তুলনায় সীমিত জনবল নিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

জেলার সচেতন মহল অবিলম্বে চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মচারীর শূন্য পদ পূরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

হাসপাতাল সেবা কমিটির সভাপতি এবং রাজবাড়ী -১ আসনের এমপি ও এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম সম্প্রতি হাসপাতালের ব্যবস্থা কমিটির এক সভায় হাসপাতালের চিকিৎসকদের শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারকরাসহ জেলার স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করার নির্দেশনা দেন। 

প্রতিমন্ত্রী সভায় বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার জনগণের সরকার, জনগণের চিকিৎসাসেবা দোড় গোড়ায় পৌঁছে দেবার দায়িত্ব আমাদের। এ লক্ষ্যেই আমাদের সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১০০ বেডের হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় রূপান্তরিত করেছে। শীঘ্রই বাকি ব্যবস্থাও সম্পন্ন করা হবে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ বাসসকে বলেন, রাজবাড়ী জেলার প্রায় ১২ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবার প্রধান ভরসা রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল। হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসকের পদগুলো বছরের পর বছর শূন্য থাকায় হাসপাতালের সক্ষমতা অনুযায়ী সেবা প্রদান সম্ভব হচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, কৃষক, শ্রমিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।

তিনি জানান, জরুরি মুহূর্তে এম্বুলেন্সে করে রোগী পাঠানোর ব্যবস্থায়ও সমস্যা দেখা দিয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালে ৪ টি সচল এম্বুলেন্স আছে, কিন্তু চালক মাত্র একজন।