শিরোনাম

\ মহিউদ্দিন সুমন \
টাঙ্গাইল, ১০ মে ২০২৬ (বাসস): নিজ জেলার চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকবে কোরবানির পশু। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলে কোরবানিযোগ্য ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৯৩ টি পশু প্রস্তুত আছে। যা নিজ জেলার চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি।
এদিকে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জেলার খামারিরা তাদের গরু পরিচর্যা ও মোটাতাজাকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রাকৃতিক উপায়ে সবুজ ঘাস, খৈল, কুটা, দানাদার খাদ্য ও দেশীয় স্বাস্থ্যসম্মত খাবার দিয়ে গরুগুলোকে হৃষ্টপুষ্ট করা হচ্ছে। বাজারমূল্য ঠিক থাকলে এবারও খামারিদের স্বপ্ন পূরণ হবে।
জেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, জেলায় ছোট বড় মোট ২৬ হাজার ৭৫৯ টি খামার রয়েছে। প্রতিটি খামারেই পর্যাপ্ত পরিমাণ দেশীয় গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে গরু মোটাতাজাকরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাঠে রয়েছে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক টিম।
এ বছর জেলার ১২ উপজেলায় কোরবানির জন্য ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৯৩ টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে গরু ১ লাখ ১৭ হাজার ২৭৮টি, মহিষ ৫০০টি, ছাগল ১ লাখ ৭ হাজার ৩৮টি ও ভেড়া রয়েছে ৯ হাজার ১৭৭টি। জেলার মোট চাহিদা ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৭৮টি পশু। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকবে ৩৯ হাজার ৮৮৩ টি পশু।
খামারিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার গো-খাদ্যের দাম অনেক বেশি। তাই গরু মোটাতাজাকরণে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে ভালো দামে গরু বিক্রি করতে পারলে লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। তবে ভারতীয় গরুর আমদানিকে কেন্দ্র করে রয়েছে বাড়তি উদ্বেগ।
খামারিরা মনে করেন, ভারতীয় গরুর আমদানি বন্ধ হলে দেশীয় গরুর চাহিদা ও দাম উভয়ই বাড়বে। এতে তাদের লাভ হবে। দেশের বাইরে থেকে যেন দেশে গরু না আসে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানান তারা।
সরেজমিনে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখা যায়, খামারিরা প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। পশুর খাদ্যতালিকায় রয়েছে কাঁচা ঘাস, ভুট্টা, খৈল, সরিষার খৈল, গমের ভুসি, ধানের কুঁড়া ও খড়। নিয়মিত গোসল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে। দেশীয় গরুর পাশাপাশি শাহিওয়াল জার্সি, ফিজিয়ান এবং ব্রাহামা প্রজাতির গরুকে প্রাকৃতিক খাবার দিয়ে হৃষ্টপুষ্ট করতে ব্যস্ত খামারিরা। প্রতিবারের মতো এবারও স্থানীয় বাজার ছাড়াও ঢাকায় গরু বিক্রির আশায় খামারিরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এদিকে খামারের বাইরেও জেলার চরাঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতে লালন-পালন করা হচ্ছে দেশীয় ষাঁড় গরু ও ছাগল। গ্রামের নারীরা স্বাবলম্বী হতে এসব গরু লালন-পালন করছেন। ভালো দাম পাওয়ার আশা তাদের।
খামারিরা জানান, কোরবানির পশু সুস্থ রাখতে ভ্যাকসিন, ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে। ফলে এ জেলার পশুর প্রতি ক্রেতাদের আস্থা বাড়ছে। তবে, পশুখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি খামারিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুট্টা, খৈল ও অন্যান্য খাদ্যের দাম বাড়ায় গরু পালনে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবুও কোরবানির বাজারে ভালো দামের আশায় খামারিরা শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় কোনো কমতি রাখছেন না। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে পশু ব্যবসায়ী ও ব্যাপারীরা খামারে গিয়ে গরু দেখে দরদাম শুরু করেছেন। অনেক খামারি খামার থেকেই পশু বিক্রি করছেন।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলা সাঁকরাইল গ্রামের নাজমুল অ্যাগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী মো. নাজমুল ইসলাম বাসসকে বলেন, দেশীয় খাবার দিয়েই গরু মোটাতাজা করছি। এখানে মোটাতাজাকরণে কোনো ধরনের কৃত্রিম মেডিসিন ব্যবহার করা হয়নি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাদ্য ও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গরুগুলো লালন করা হয়েছে। আমার ফার্মে কোরবানির জন্য ৫১টি ষাঁড় প্রস্তুত করা হয়েছে। এই ফার্মের প্রতিটি গরু দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা দামের মধ্যে। ইন্ডিয়ান গোরু দেশে না আসলে আশা করি লাভবান হতে পারবো।
এ খামারে কর্মরত শ্রমিক মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, আমি দীর্ঘ ১৮ বছর যাবৎ এ ফার্মে কাজ করছি। নিজের সন্তানের মতো করে গরুগুলোকে বড় করেছি। কোনো ওষুধ ছাড়াই শুধু ঘাস, ভুট্টা, খৈল আর কুঁড়া খাইয়েছি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পশুর যত্ন নিতে হয়। সময়মতো খাবার দেওয়া, গোসল করানো আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাই আমাদের কাজ।
ক্ষুদ্র খামারি আব্দুল মজিদ বলেন, কোনো ওষুধ ছাড়াই শুধু ঘাস আর কুঁড়া খাইয়েছি। কিন্তু বাজারে গেলে সবকিছুর যে দাম, তাতে এবার কপালে কী আছে জানি না। সরকার যদি ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ রাখে, তবেই আমাদের মতো গরিব খামারিরা বাঁচবে।
পারিবারিক খামারের মালিক মিন্টু মিয়া বলেন, প্রতি বছর ৪ থেকে ৫টা গরু পালি লাভের আশায়। এবার ৪টি ষাঁড় গরু রয়েছে। খৈল ও ভুসির যে দাম তাতে লাভ হবে কি না সন্দেহ। তবে আমার গরুগুলো মাশাল্লাহ অনেক সুন্দর হয়েছে। আশা করছি সরাসরি বাড়ি থেকেই বিক্রি করতে পারবো।
খামারি তোফাজ্জল হোসেন জানান, বর্তমানে আমার খামারে আটটি গরু রয়েছে। যেগুলোর দাম দুই লাখ থেকে শুরু করে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বড় দুটি গরুর ওজন ৬০০ কেজিরও বেশি। এ বছর ভালো দামে গরু বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হেলাল উদ্দিন বাসসকে জানান, এ বছর জেলার চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে। কোরবানির হাটে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও নির্বিঘ্ন বেচাকেনা নিশ্চিত করতে প্রশাসনও প্রস্তুত। পশু অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, খামারিদের দানাদার খাদ্য, কাঁচা ঘাস ও ভিটামিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোনো ধরনের নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার না করতে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তবে, হাটে বিদেশি গরুর অনুপ্রবেশ ঠেকানো গেলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির সুফল ঘরে তুলতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
টাঙ্গাইল (সদর)-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বাসসকে বলেন, সারা দেশে ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি গবাদিপশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণে পশু আমাদের মজুদ আছে। কাজেই বাইরে থেকে কোরবানির পশু আনার দরকার নেই।
তিনি বলেন, পশুর বাজার ব্যবস্থাপনা যাতে সঠিক থাকে সেই অনুযায়ী প্রত্যেক হাটে ভেটেরিনারি ডাক্তাররা দায়িত্ব পালন করবে। অন্যদিকে কোরবানির পশু কোনোভাবেই বাইরের থেকে অবৈধ পথে যাতে প্রবেশ করাতে না পারে, সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বর্ডার এলাকায় দায়িত্বরত বিডিআর বাহিনীকে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।