শিরোনাম

॥ রেজাউল করিম মানিক ॥
রংপুর, ১০ মে, ২০২৬, (বাসস) : বিশ্বে মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও রংপুর বিভাগে এখনও মাছের ঘাটতি কাটেনি।
দেশের রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগে হাজার হাজার টন মাছ উদ্বৃত্ত থাকলেও রংপুরে চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে বিভাগটির ৮ জেলায় প্রায় ১৯ হাজার মেট্রিক টন মাছের ঘাটতি রয়েছে।
এই ঘাটতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে পানির সংকট। রংপুর বিভাগের প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার পুকুরের মধ্যে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার পুকুরে সারা বছর পানি থাকে না।
অধিকাংশ পুকুরে মাত্র ৩ থেকে ৪ মাস পানি থাকে, বছরের বাকি সময় শুকনো পড়ে থাকে। ফলে এসব পুকুরে সারা বছর মাছ চাষ করা সম্ভব হয় না।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে ৫০টি নদ-নদী, প্রায় ১২০০ খাল এবং ৮৩৭টি বিল থাকলেও স্থায়ী জলাশয়ের সংখ্যা তুলনামূলক কম।
অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অধিকাংশ পুকুরে পানি থাকে না, ফলে এ সময় মাছ চাষ বন্ধ থাকে। মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য পানি থাকায় উৎপাদনও কম হয়। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় পরিস্থিতি আরও খারাপÑএই তিন জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ পুকুরে দীর্ঘ সময় পানি থাকে না।
রংপুর বিভাগের প্রায় দেড় কোটির বেশি মানুষের জন্য মাছ একটি গুরুত্বপূর্ণ আমিষের উৎস। গড়ে একজন মানুষের দৈনিক মাছের চাহিদা ৬০ গ্রাম হিসেবে বছরে প্রায় ২২ কেজি। সেই অনুযায়ী এ অঞ্চলের মোট বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু চলতি বছরে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। ফলে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে ১৯ হাজার মেট্রিক টনের বেশি।
একসময় রংপুর অঞ্চলের নদ-নদী, খাল-বিল ছিল প্রায় ২০০ প্রজাতির দেশীয় মাছের নিরাপদ আবাসস্থল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং পানির স্বল্পতার কারণে বর্তমানে প্রায় ৩০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। এর ফলে মানুষের খাদ্য তালিকায় আমিষের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
মৎস্য বিভাগের মতে, মাছের ঘাটতির পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছেÑমৎস্য চাষে আধুনিক প্রযুক্তির কম ব্যবহার, মাছের খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি এবং এই অঞ্চলে মৎস্যখাতে পর্যাপ্ত সরকারি প্রণোদনার অভাব। বর্তমানে শুধু কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ মৌসুমে কিছু জেলে সীমিত সহায়তা পান, কিন্তু সামগ্রিকভাবে মৎস্যচাষিদের জন্য উল্লেখযোগ্য সহায়তা নেই।
এছাড়া তিস্তার উজানে বাঁধ নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে এ অঞ্চলে পানির প্রবাহ কমে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে জলাশয়গুলোতে। দিনাজপুর অঞ্চলের বালুময় ও কাঁকরযুক্ত মাটির কারণে পানির ধারণক্ষমতাও কম, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে মৎস্য বিভাগ বলছে, পরিস্থিতি উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভাগের ৫৮টি উপজেলায় মাছের জন্য একাধিক অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে এবং দেশি প্রজাতির মাছ চাষে চাষিদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
রংপুর মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মঞ্জুরুল ইসলাম বাসসকে জানান, ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলে প্রতি বছর মাছের ঘাটতি কমছে। পুকুরে ১২ মাস পানি ধরে রাখার প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহারে চাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রংপুর বিভাগ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে এবং উদ্বৃত্ত মাছ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে।