শিরোনাম

\ ইব্রাহিম খলিল মামুন \
কক্সবাজার, ৯ মে ২০২৬ (বাসস): কক্সবাজারের প্রশাসনিক মানচিত্রে যুক্ত হলো নতুন নাম ‘মাতামুহুরি’। নতুন উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হলে বদলে যাবে এই জনপদের অর্থনীতি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটায় বাসিন্দাদের জীবনমানেরও উন্নয়ন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চকরিয়া উপজেলার একটি বড় অংশ নিয়ে গঠন করা হচ্ছে নতুন এই উপজেলা। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ায় মাতামুহুরির বাসিন্দাদের মধ্যে বইছে আনন্দের বন্যা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নতুন এই উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড শুরু হলে দ্রুত উন্নত হবে এই জনপদ। বদলে যাবে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার চিত্র।
প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১২০তম বৈঠকে এ সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (৭ মে) বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে চকরিয়াকে বিভক্ত করে নতুন উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্তটি বাস্তবে রূপ নেয়। নতুন এই উপজেলার আওতায় আসছে বদরখালী, পশ্চিম, বড় ভেওলা, পূর্ব বড় ভেওলা, সাহারবিল, বিএমচর, কোনাখালী ও ঢেমুশিয়া ইউনিয়ন।
ভৌগোলিক বিস্তৃতি, নদীবেষ্টিত জনপদ আর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই পৃথক উপজেলা গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় সেই দাবিকে সামনে এনে নতুন উপজেলা সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি চকরিয়ার ইলিশিয়ায় জমিলা বেগম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক নির্বাচনি জনসভায় বলেছিলেন, ‘মাতামুহুরি উপজেলা বাস্তবায়ন এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এবং ইনশাল্লাহ তা বাস্তবে রূপ দেওয়া হবে।’
তিনি জানান, মাতামুহুরি নদীবেষ্টিত এলাকাকে সমৃদ্ধ ও শস্যভান্ডারে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েই অতীতে নদী শাসন, সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন। ঈদমনি থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণও সেই বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ ছিল। পাশাপাশি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ ওই জনসভায় বলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেমে গেলেও ১৭ বছর পর আবারও জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে মাতামুহুরি উপজেলা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিচ্ছি। সেখানে উপজেলা অফিস, হাসপাতাল, পশুপালন অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস, এসি ল্যান্ড অফিসসহ সব ধরনের সরকারি সেবা নিশ্চিত করা হবে।’ নতুন উপজেলার সদর দফতর কোথায় হবে, তা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত করা হবে বলে সেসময় জানান তিনি।
অবশেষে নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোনোয় স্থানীয়রা এটিকে তার বড় রাজনৈতিক সফলতা হিসেবে দেখছেন। তাদের আশা, নতুন উপজেলা বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনিক সেবা পেতে আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে না। বাড়ির কাছেই মিলবে ভূমি, স্বাস্থ্য, কৃষি, রেজিস্ট্রি ও আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সরকারি সেবা। এতে যেমন : বাড়বে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, তেমনি সহজ হবে সরকারি সুযোগ-সুবিধার বণ্টন।
ইলিশিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. আরিফ বলেন, ‘আমাদের বহু দিনের স্বপ্ন ছিল মাতামুহুরি উপজেলা। এখন যদি উপজেলা হয়, তাহলে মানুষ অনেক সুবিধা পাবে। চিকিৎসা, অফিস-আদালত সব কাছাকাছি হবে।’
বদরখালী এলাকার বাসিন্দা রশিদ আহাম্মদ বলেন, ‘চকরিয়া অনেক বড় উপজেলা ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষকে যেতে কষ্ট হতো। নতুন উপজেলা হলে এই এলাকার উন্নয়ন দ্রুততর হবে।’
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রশাসনিক স্বীকৃতি পেলেও এখন দেখার বিষয়, কত দ্রুত নতুন মাতামুহুরি উপজেলার কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়। রাজনীতিবিদদের আশা, নতুন এই উপজেলা বদলে দেবে পুরো জনপদের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার চিত্র।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির দফতর সম্পাদক ইউসুফ বদরী বাসসকে বলেন, ‘আশা করছি, নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন খুব শিগ্গিরই শুরু হবে। সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলার প্রায় আড়াই লাখ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানা বঞ্চনার মধ্যে ছিল। নতুন উপজেলা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্টসহ সার্বিক উন্নয়নে নতুন করে বরাদ্দ ও পরিকল্পনা আসবে। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং সাধারণ জনগণ দ্রুতই এর সুফল ভোগ করতে পারবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবর রহমান বাসসকে বলেন, চকরিয়ার বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে নতুন মাতামুহুরি উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্ত এই অঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করে বাস্তব উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবে সরকার।