বাসস
  ০৭ মে ২০২৬, ২০:৪৫

আলোর বাতিঘর সুনামগঞ্জের ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’

ছবি : জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি

মুহাম্মদ আমিনুল হক

সুনামগঞ্জ,৭ মে, ২০২৬ (বাসস) : শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাশ ছিলেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একজন অকুতভয় সৈনিক। সুনামগঞ্জে তার নামে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’। আলোর বাতিঘর হিসেবে পরিচিত ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’টি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জেলার সাহিত্যানুরাগীরা জ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধ হতে পারছেন। তাই সুনামগঞ্জকে অনেকেই সাহিত্য ও বাউল গানের উর্বর ভূমি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। 

১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল জগৎজ্যোতি দাসের জন্ম হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জের জলসুখা গ্রামে। সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি একজন গেরিলাযোদ্ধা ছিলেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার কতৃক মরেণোত্তর বীর বিক্রম উপাধি লাভ করেন জগৎজ্যোতি দাস। 

‘জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’র ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৫৯ সালের ১৭ জুন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক বি আর নিজাম। এ বৈঠকে তাঁকেই সভাপতি ও শহরের আরেক গুণীজন মনোরঞ্জন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি পাঠাগারের যাত্রা শুরু করা হয়। 

সেদিনের বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন মফিজ চৌধুরী, আবু হানিফা আহমদ (নবাব মিয়া), মনোরঞ্জন চৌধুরী, এম এইচ চৌধুরী, নাজির উদ্দিন, হেমচন্দ্র চৌধুরী, এ এফ এম আবদুল আলী, এ কে সরকার, সুরেশ চন্দ্র আচার্য্য, এম হোসাইন, দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরী, আফাজ উদ্দিন আহমদ, টি হোসাইন, এ গণি, অক্ষয় কুমার দাস, লতিফ উদ্দিন চৌধুরী।

অ্যাডভোকেট হুমায়ূন মঞ্জুর চৌধুরী ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’র বার্ষিক আলোচনা সভায় স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে লাইব্রেরি সম্পর্কে ৬০ বছর আগের স্মৃতি তুলে ধরেন। 

তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যানের কক্ষে নিয়মিত আড্ডায় বসতেন শহরের গুণীজনরা। আর এ বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয় একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার। ওই দিন থেকেই লাইব্রেরিটির যাত্রা শুরু হয়ে আজও শহরে আলো ছড়াচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’র পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায় এ তথ্য। দীর্ঘ ৬০ বছরের যাত্রায় শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা ঘটনার সাক্ষী এ ‘পাঠাগার’। শহরের শত মানুষের সুখস্মৃতি জড়িয়ে আছে এই গ্রন্থাগারে। একসময়ের টিনশেড ভবন থেকে এখন সুরম্য দ্বিতল ভবন হয়েছে। প্রায় ৩০ হাজার বইয়ের বিশাল ভান্ডার আছে এখানে।

শুরুতে ‘পাঠাগার’টির নাম ছিল ‘সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি’। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগার’ নামে নামকরণ করা হলেও ব্র্যাকেটে ‘সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি’ কথাটি যুক্ত ছিল। সর্বশেষ নাম ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’টি আলোর বাতিঘর হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠে। 

শহরের কেন্দ্রস্থল ট্রাফিক পয়েন্ট (আলফাত স্কয়ার) থেকে সামান্য পূর্ব দিকে ডি এস রোডের উত্তর পাশে এ লাইব্রেরিটির অবস্থান। এর নিচতলায় বিশাল পাঠকক্ষ, অফিসকক্ষ ও সাধারণ সম্পাদকের বসার আরেকটি কক্ষ রয়েছে। দোতলায় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মিলনায়তন। আর পূর্ব পাশে রয়েছে গ্রন্থাগারের নিজস্ব একটি বিপণিবিতান।

লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত বিশিষ্টজনেরাই প্রথমে উপহার স্বরূপ গ্রন্থাগারে বই প্রদান করেন। পাশাপাশি বই সংগ্রহ করেন এবং স্থানীয় মানুষদের লাইব্রেরিতে এসে বই পড়তে উৎসাহিত করেন। পরে শহরের স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও লাইব্রেরিতে এসে বই পড়তে শুরু করেন। 

শান্ত-নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত লাইব্রেরিতে শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন প্রতিদিন বিকেলে বই, পত্র পত্রিকা পড়তে আসেন। অনেকে আবার বাড়িতে নিয়েও পড়েন পছন্দের বই। লাইব্রেরিতে নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা, সুধী সমাবেশ, রবীন্দ্র ও নজরুলজয়ন্তী উদযাপন করা হয়। 

১৯৮৬ সালে পাঠাগারের পাকা ভবন নির্মিত হয়। ২০০২ সালে ভবনটির দ্বিতীয় তলা নির্মাণ করা হয়। পাঠাগারে ৫৪টি আলমারিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কবিতা, গান, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণ ও শিশুতোষসহ বিভিন্ন ধরনের বই। এখানে স্নাতক সম্মান বর্ষের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইও রাখা হয়েছে। লাইব্রেরির ওয়েবসাইটে এ-সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য দেয়া আছে। 

এছাড়াও এ লাইব্রেরিতে এখন দেশের শীর্ষ স্থানীয় জাতীয় দৈনিক ও আঞ্চলিক পত্রিকাসহ সুনামগঞ্জের সব স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা রাখা হয়। পাশাপাশি রাখা হয় ম্যাগাজিনও। প্রতিদিন বেলা ৩ টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পাঠকক্ষ খোলা থাকে। 

লাইব্রেরিতে বর্তমানে দাতা, আজীবন, সাধারণ ও শিক্ষার্থী সদস্য আছেন ৭৫৮ জন। ২০১৪ সাল থেকে গ্রন্থাগার পরিচালনা কমিটির দ্বিবার্ষিক নির্বাচন শুরু হয়। পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক এই কমিটির সভাপতি হন। লাইব্রেরির বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন অ্যাডভোকেট খলিল রহমান। লাইব্রেরিতে কর্মী আছেন ৪ জন।

সুনামগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থের লেখক আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, পাঠাগার পরিচালনার জন্য ১৯৬২ সালে একটি গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা হয়।

লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক খলিল রহমান বাসস’কে বলেন, ‘আধুনিকায়নের যুগে নানা মাধ্যম থাকার পরও মানুষ লাইব্রেরিতে বই, পত্র পত্রিকা পড়তে আসেন। অনেকে আবার বাড়িতে বই নিয়ে পড়েন। এতে আমরা আনন্দ পাই। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও তাদের পাঠের সুবিধার্থে লাইব্রেরিতে এসে সহযোগিতা নেন।

জগন্নাথপুর শাহজালাল মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) এনামুল কবির বাসস’কে বলেন-লাইব্রেরিতে সাহিত্যপ্রেমীরা নিয়মিত প্রতি বিষোদবারে (বৃহস্পতিবার) বৈঠক করেন। যেখানে কবি, সাহিত্যিক, গল্পকারসহ সাহিত্যপ্রেমীরা আসেন। ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’টি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে।