বাসস
  ০২ মে ২০২৬, ১৫:১১

জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে স্ক্রিনিং ও টিকাদানের ওপর গুরুত্বারোপ বিশেষজ্ঞদের

প্রতীকী ছবি

॥ সৈয়দ রুবাইয়াত হাবিব ॥

ঢাকা, ২ মে, ২০২৬ (বাসস) : দেশে জরায়ুমুখ ক্যান্সার (সার্ভিক্যাল ক্যান্সার) প্রতিরোধে দেশব্যাপী স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা বাড়ানো, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) টিকার আওতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। 

তারা সতর্ক করে বলেছেন, লোকলজ্জা এবং দেরীতে রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণে প্রতিরোধযোগ্য সত্ত্বেও দেশে এই রোগে মৃত্যুর হার বাড়ছে।

আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেলী নার্গিস বলেন, ‘মানুষকে বুঝতে হবে যে এটি কোনো লজ্জার বিষয় নয়, বরং একটি প্রতিরোধ ও নিরাময়যোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা।’

তিনি জানান, প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে এই ক্যান্সার নিরাময়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তবে সচেতনতার অভাব ও লোকলজ্জার ভয়ে অধিকাংশ রোগী একেবারে শেষ পর্যায়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। ফলে চিকিৎসা দেওয়াটা জটিল হয়ে ওঠে।

ডা. নার্গিস আরও জানান, জরায়ুমুখ ক্যান্সার সাধারণত ১০ বছর ধরে বিকশিত হয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না। ফলে নিয়মিত স্ক্রিনিং না করলে রোগীর অজান্তেই রোগটি বাড়তে থাকে।

উপসর্গ বা লক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, অস্বাভাবিক সাদা স্রাব, অনিয়মিত রক্তপাত-বিশেষ করে যৌন মিলনের পর বা মেনোপজ পরবর্তী রক্তপাত এবং রোগের শেষ পর্যায়ে তলপেট বা পিঠে ব্যথা হতে পারে। 

এই ক্যান্সারের মূল কারণ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি), বিশেষ করে ১৬ ও ১৮ নম্বর টাইপ। এটি সাধারণত যৌন সংসর্র্গের মাধ্যমে ছড়ায় এবং দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ জরায়ুমুখের কোষে ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনে। ৩৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারীরা এর উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। 

এছাড়া কম বয়সে বিয়ে ও শারীরিক সম্পর্ক, একাধিক যৌনসঙ্গী, ঘন ঘন গর্ভধারণ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং ধূমপান এই রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। 

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার এবং প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিভাগের সাবেক সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. সৈয়দা রিফাত বিনতে হাবিব বলেন, জরায়ুমুখ ক্যান্সার পরীক্ষায় দেশে ‘ভিআইএ’ (অ্যাসেটিক অ্যাসিড দিয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা) পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী নারীদের জন্য প্রযোজ্য।  

এছাড়া প্যাপ স্মিয়ার এবং এইচপিভি ডিএনএ টেস্টের সুবিধাও রয়েছে। তবে অনেক নারীই জানেন না যে এসব পরীক্ষা সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য। জানলেও লজ্জা, ভয় ও ভুল ধারণার কারণে স্ক্রিনিং করাতে আগ্রহ দেখান না।

প্রতিরোধের দ্বিতীয় ধাপ হল টিকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৯ থেকে ১৩ বছর বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে এইচপিভি টিকা জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।

ডা. সৈয়দা রিফাত জানান, বাংলাদেশে ২০২৩ সাল থেকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় এই টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে এবং এর পরিধি পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। তবে টিকা নিয়ে জনমনে এখনও ভুল ধারণা রয়েছে। 

অনেকে মনে করেন এটি ক্ষতিকর বা অপ্রয়োজনীয়, যা টিকাদান কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল জনসচেতনতা। শহর ও গ্রাম, উভয় অঞ্চলেই সচেতনতার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। অনেক নারী এই রোগের নামই জানেন না। আবার অনেকে আশিংকভাবে জানেন। ফলে তারা প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং বা চিকিৎসা নিতে দেরী করেন। চিকিৎসকদের মতে, রোগীর দেরী করে আসাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

ডা. সোহেলী নার্গিস মনে করেন, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও স্বাস্থ্যখাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব নয়। 

তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারভিযান, কমিউনিটি-ভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং নারী স্বাস্থ্য বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা এখন সময়ের দাবি। 

তিনি আরও বলেন, ভয় ও কুসংস্কার কাটিয়ে নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে উৎসাহিত করতে পরিবারকেও এগিয়ে আসতে হবে।

ডা. সৈয়দা রিফাতের মতে, স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা সরাসরি প্রান্তিক পর্যায়ে নারীদের সঙ্গে কথা বলে সহজ ভাষায় বিষয়টি বোঝালে ভয় ও ভুল ধারণা অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি ধর্মীয় নেতা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করতে পারলে সুফল পাওয়া যাবে, কারণ মানুষ তাদের কথাকে গুরুত্ব দেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত স্ক্রিনিং, টিকা ও ব্যাপক সচেতনতা-এই তিনটি ধাপকে কার্যকর করা গেলে দেশে জরায়ুমুখ ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব। 

সচেতনতা বাড়লে মানুষ ভয় ও লোকলজ্জা কাটিয়ে সময়মতো চিকিৎসা নেবেন। ফলে  প্রতিরোধযোগ্য এই রোগের ঝুঁকি কমে যাবে।