শিরোনাম

ঢাকা, ১৯ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় ৫ হাজার ৮৯০ জন কৃষকের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের মূলধন ও সুদ মওকুফ এবং তাদের মধ্যে ২৯ হাজার ৪৫০টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা বিতরণ করা হবে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক স্বস্তি নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সরকার একযোগে ঋণ মওকুফ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগে কৃষকদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করছে। কৃষক দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি। তাই তাদের আর্থিক চাপ কমিয়ে উৎপাদনে আরও উৎসাহিত করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, এ বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠকে দেশের কৃষকদের দেওয়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের মূলধন ও সুদ সম্পূর্ণ মওকুফের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে দেশের প্রায় ১২ লাখ প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক এবং বর্গাচাষীর ঋণ পরিশোধ করেছে। এর ফলে তারা শুধু ঋণের দায় থেকেই মুক্ত হচ্ছেন না, বরং দীর্ঘদিন ধরে ঋণখেলাপি হিসেবে যেসব সার্টিফিকেট মামলার আসামি ছিলেন, সেসব মামলা থেকেও অব্যাহতি পাচ্ছেন। এতে তারা নতুন করে ব্যাংকঋণ গ্রহণ, কৃষি উপকরণ সংগ্রহ এবং উৎপাদন কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘অনেক কৃষক অল্প পরিমাণ ঋণের কারণেই বছরের পর বছর ঋণখেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন। এতে তারা সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। সরকার সেই অবস্থা পরিবর্তন করতে চায়। কৃষকের মাথা থেকে ঋণের বোঝা নামিয়ে এনে তাকে আবার উৎপাদনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনাই আমাদের লক্ষ্য।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, বোদা উপজেলায় এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ৫ হাজার ৮৯০ জন কৃষকের মোট প্রায় ৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকার কৃষিঋণ (মূলধন ও সুদসহ) মওকুফ করা হবে। এর ফলে উপজেলার হাজারো কৃষক নতুনভাবে কৃষিকাজে আত্মনিয়োগের সুযোগ পাবেন।
তিনি বলেন, ‘বোদা একটি কৃষিনির্ভর উপজেলা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়লে শুধু কৃষি উৎপাদনই নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’
ঋণ মওকুফের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় কৃষকদের মধ্যে গাছের চারা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রত্যেক কৃষককে পাঁচটি করে ফলজ, বনজ অথবা ঔষধি গাছের চারা দেওয়া হবে। সে অনুযায়ী বোদা উপজেলায় মোট ২৯ হাজার ৪৫০টি গাছের চারা বিতরণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘একদিকে কৃষকের ঋণের বোঝা কমানো হচ্ছে, অন্যদিকে তাকে পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। কৃষক যদি নিজের বাড়ি, জমির আইল বা খালি জায়গায় এসব গাছ রোপণ করেন, তাহলে তা যেমন পরিবেশের জন্য উপকারী হবে, তেমনি ভবিষ্যতে পরিবারের অতিরিক্ত আয়ের সুযোগও সৃষ্টি করবে।’
ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, সরকার কৃষিকে শুধু উৎপাদনের বিষয় হিসেবে দেখছে না; বরং এটিকে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। এজন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, সেচ সুবিধা, উন্নত বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি। এ বাস্তবতায় কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের সম্পৃক্ত করে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো- কোনো কৃষক যেন সামান্য ঋণের কারণে উৎপাদন থেকে পিছিয়ে না পড়েন। কৃষকের উৎপাদন অব্যাহত থাকলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী এবং গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীল হবে।
তিনি বলেন, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই কৃষকের পাশে দাঁড়ানো সরকারের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। বর্তমান সরকার সেই দায়িত্ব পালনে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’
ফরহাদ হোসেন আজাদ আশা প্রকাশ করেন, ঋণ মওকুফ ও গাছের চারা বিতরণ কর্মসূচি কৃষকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে। এতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবেশও আরও সবুজ ও সমৃদ্ধ হবে।
তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সমন্বিতভাবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারের প্রতিটি কৃষকবান্ধব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষি আরও শক্তিশালী হবে এবং টেকসই উন্নয়ন অর্জনের পথ সুগম হবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, কৃষককে শুধু সহায়তা নয়, মর্যাদাও দিতে হবে। কারণ কৃষকের শ্রমেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। সরকারের এই কর্মসূচি সেই মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, ঋণমুক্ত হওয়ার ফলে বোদা উপজেলার ৫ হাজার ৮৯০ জন কৃষক নতুন উদ্যমে কৃষিকাজ শুরু করতে পারবেন। একই সঙ্গে ২৯ হাজার ৪৫০টি গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে নেওয়া সবুজায়ন কর্মসূচি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।