বাসস
  ১৯ জুলাই ২০২৬, ১৫:৫১

সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদনে সফল মৎস্য উদ্যোক্তা তালার রেখা 

ছবি: বাসস

॥ মো. আসাদুজ্জামান ॥

সাতক্ষীরা, ১৯ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : আধুনিক পদ্ধতিতে কার্প জাতীয় সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদন করে সাড়া ফেলেছেন জেলার তালা উপজেলার মৎস্য উদ্যোক্তা রেখা রাণী মন্ডল। সংসারের শত ব্যস্ততার মাঝেও হারিয়ে যায়নি তার লালিত স্বপ্ন। রান্নাঘর থেকে পুকুর পাড় দুই দায়িত্বই সমানতালে সামলে গড়ে তুলেছেন সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদনের খামার। 

দৃঢ় প্রত্যয়, কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে রেখা রাণী  মন্ডল (৩৯) আজ সফল উদ্যোক্তা। তার মতো অর্ধশতাধিক মৎস্যচাষি এখন তালা উপজেলায় মাছের পোনা উৎপাদন করে সফলতার মুখ দেখছেন। সাতক্ষীরা উন্নয়ন সংস্থা (সাস) থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এসব উদ্যোক্তারা। মাছ চাষ সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা ছিল না রেখা রাণী  মন্ডলের মতো অনেকেরই। পরে সাস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বদলে যায় তাদের জীবন। 

রেখা রাণী মন্ডল বর্তমানে তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের বয়ারসিং গ্রামে দুই বিঘা জমিতে সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদন করে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শুধু নিজেই সফল নন, তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে এলাকার আরও অনেকেই মাছ উৎপাদন শুরু করেছেন। স্থানীয় মাছ চাষিরা এখন তার কাছ থেকেই মাছের চারা সংগ্রহ করছেন।

ছবি: বাসস

বাসসের সাথে আলাপকালে রেখা রাণী  মন্ডল জানান, আগে তিনি ঠিকমতো মাছ চাষ করতে পারতেন না। সাস থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর দুই বিঘা জমিতে সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদন শুরু করেন। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন অনেকেই তার কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন। তার উৎপাদিত রেণু পোনা সংগ্রহ করছেন স্থানীয় মৎস্যচাষিরা। এখন সংসারে তার স্বামীর পাশাপাশি তিনিও অর্থনৈতিকভাবে অবদান রাখতে পারছেন। পাশাপাশি দুই ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালাতেও তিনি একটি বড় ভুমিকা রাখছেন। তিনি জানান, তার এ কাজে তার স্বামী মনোরঞ্জন মন্ডল সব সময় সহযোগিতা করে থাকেন।

রেখার স্বামী মনোরঞ্জন মন্ডল জানান, মাছ উৎপাদনের খামারে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই অক্লান্ত পরিশ্রম করেন বলেই আজ তারা সফলতার মুখ দেখছেন।  

স্থানীয় বাসিন্দা পূজা রাণী মন্ডল বলেন, রেখা রাণীর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে তিনিও সাদা মাছের রেণু পোণা উৎপাদন শুরু করেছেন। আরও অনেকেই তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছেন বলে এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়। 

স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, আগে মাছের রেণু পোনা কিনতে তাদের যশোরসহ বিভিন্ন এলাকায় যেতে হতো। এখন নিজ এলাকাতেই সহজে মানসম্মত রেণু পোনা পাওয়া যায়।

এতে সময়, খরচ এবং পরিবহনজনিত ঝুঁকি সবই কমে গেছে। এছাড়া মাছ মরে যাওয়ার আশঙ্কাও কমে গেছে বলে তারা জানান।

স্থানীয় যুবক রেজাউল ইসলাম জানান, তিনি রেখা রাণীর সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদনের খামারটি দেখতে এসেছেন। এটি দেখে তিনি খুবই মুগ্ধ হয়েছেন। তিনিও রেখার পরামর্শ নিয়ে সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদনের খামার করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন।  

সাসের এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট অফিসার মো. ইকরামুল হাসান বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে মৎস্যচাষিদের দক্ষ করে তোলা হয়। এর ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এবং এলাকায় মানসম্মত মাছের চারা সরবরাহ করে এলাকার চাহিদা পূরণ করতে পারছেন ।

সাসের নির্বাহী পরিচালক শেখ ইমান আলী বাসসকে বলেন, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় পরিচালিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে আরও বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার কাজ চলমান রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত কারিগরি সহায়তার ফলে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় কার্প জাতীয় সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।  এতে একদিকে যেমন স্থানীয় চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামীণ পরিবারগুলোর আয় বাড়িয়ে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার পথও সুগম করছে।

তালা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. তারিক ইমাম বলেন, রেখা রাণীর সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদন এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আশপাশের মৎস্যচাষিরা এখন নিজ এলাকা থেকেই উন্নত জাতের মাছের পোনা সংগ্রহ করতে পারছেন। রেখা রাণী সহ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অন্যান্য উদ্যোক্তারাও তালা উপজেলার মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। 

তিনি বলেন, একজন গৃহিণী থেকে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা রেখা রাণী মন্ডলের এই পথচলা প্রমাণ করে সঠিক প্রশিক্ষণ ও পরিশ্রম করলে নারীরাও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেন।