শিরোনাম

॥তানজিম আনোয়ার॥
ঢাকা, ১৯ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ ও যাত্রী বহনের সক্ষমতা বাড়াতে ২০২৭ সালের মধ্যে ১০টি উড়োজাহাজ লিজ (ভাড়া) নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
নতুন কেনা ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ২০৩১ সাল থেকে বিমান বহরে যুক্ত হবে। তবে তার আগ পর্যন্ত সক্ষমতার ঘাটতি পূরণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আজ বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বাসসকে বলেন, ‘আমরা এ বছরের মধ্যে ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করছি। এর ফলে আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়াতে পারব। পাশাপাশি নতুন গন্তব্যে সেবা সম্প্রসারণ করাও সম্ভব হবে।’
তিনি জানান, রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই সংস্থা প্রাথমিকভাবে তিনটি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। তবে কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা এবং রুট সম্প্রসারণের কৌশলের ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যা বাড়তে পারে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিমানের বর্তমান ১৯টি উড়োজাহাজের বহর ২০২৭ সালের মধ্যে বেড়ে ২৯টিতে দাঁড়াতে পারে, যা ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি এবং সংস্থাটির স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে বড় সক্ষমতা সম্প্রসারণগুলোর একটি।
মিল্লাত বলেন, লিজ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে সরকার। এই প্রক্রিয়া তদারকির জন্য একজন আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা লিজ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে চাই। সেজন্য আমরা একজন আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে প্রায় ৪০টি আবেদন জমা পড়েছে এবং এর মধ্য থেকে একটি যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বেছে নিয়ে পুরো লিজ প্রক্রিয়া তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হবে।’
লিজ নেওয়ার এই উদ্যোগটি বিমানের ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পিত প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বোয়িংয়ের সাথে এই চুক্তির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। নতুন এই উড়োজাহাজগুলো ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
‘বোয়িং’ এবং ‘এয়ারবাস’-এর মতো প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন তৈরিকৃত উড়োজাহাজ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই ক্রমবর্ধমান যাত্রীদের চাহিদা মেটাতে অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান হিসেবে আন্তর্জাতিক লিজ বাজারের দিকে ঝুঁকছে বিমান। এর মাধ্যমে বিদ্যমান রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো এবং নতুন গন্তব্য চালু করা হবে।
উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিমান ইতোমধ্যেই ছয় বছরের জন্য তিনটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ড্রাই লিজে নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক প্রস্তাব আহ্বান করেছে। ২০২৭ সালের শুরুতে এগুলো বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ১৫ জুলাই প্রকাশিত একটি ‘রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল’ (আরএফপি) অনুযায়ী, বিমান ৭২ মাসের ড্রাই লিজে তিনটি ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজের জন্য উড়োজাহাজের মালিক, নির্মাতা, এয়ারলাইনস, অপারেটর ও লিজ প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করছে।
ড্রাই লিজ ব্যবস্থার আওতায় বিমান চালক (ক্রু), রক্ষণাবেক্ষণ বা বীমা ছাড়াই উড়োজাহাজ লিজ নেবে। বিমান নিজস্ব এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেটের অধীনে নিজস্ব কর্মী দিয়ে এগুলো পরিচালনা করবে।
প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ৯ আগস্ট নির্ধারণ করেছে বিমান। উড়োজাহাজ সরবরাহের পছন্দের তারিখ হিসেবে ১ জানুয়ারি, ২০২৭ জানানো হয়েছে। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরবরাহ করা উড়োজাহাজও বিবেচনা করা হতে পারে।
বিমান আশা করছে, লিজ নেওয়া প্রতিটি উড়োজাহাজ বার্ষিক প্রায় ৪ হাজার ঘণ্টা ফ্লাইট পরিচালনা করবে। বিমান শর্ত দিয়েছে যে, উড়োজাহাজগুলোর বয়স ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ১৫ বছরের বেশি হতে পারবে না। এগুলো জিইএনএক্স-১বি৭৪/৭৫ (GEnx-1B74/75) ইঞ্জিন চালিত হতে হবে। এছাড়া ৩০০টির বেশি আসনসহ দুই শ্রেণির কেবিন বিন্যাস থাকতে হবে।
বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার, দু’টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার, চারটি বোয়িং ৭৩৭ এবং পাঁচটি ড্যাশ ৮-৪০০ টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ।
বোয়িং ক্রয়ের পাশাপাশি সরকার দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অংশ হিসেবে এয়ারবাস-এর উড়োজাহাজ সংগ্রহের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে। এর উদ্দেশ্য হলো একটি টেকসই মিশ্র বিমানবহর গড়ে তোলা।
পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম আগে বলেছিলেন, বোয়িং ও এয়ারবাস উভয় প্রতিষ্ঠান থেকেই উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের বোয়িং এবং এয়ারবাস উভয়ই প্রয়োজন। আমরা দুটিই কিনব।’
তিনি জানান, বিনিয়োগ এবং ক্রয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার থাকবে।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত এবং ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঊর্ধ্বতন কূটনীতিকদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও এয়ারবাস-এর বিষয়টি আলোচনায় আসে।
বৈঠকে সরকার বিমানের দীর্ঘমেয়াদী বহর সম্প্রসারণ কর্মসূচিতে এয়ারবাস-এর উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করে। অন্যদিকে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা এই বিষয়ে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানান।
বিমানের এই সম্প্রসারণ এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্পে দ্রুত সক্ষমতা বৃদ্ধির সময় চলছে। বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোও তাদের বহর এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স প্রায় ১.১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের একটি সম্প্রসারণ কর্মসূচির আওতায় ২১টি বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ ২০২৭ সালে লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি এয়ার অ্যাস্ট্রা এবং নভোএয়ারও বহর সম্প্রসারণ এবং নতুন আন্তর্জাতিক রুটের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
এভিয়েশন বিশ্লেষক এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক যাত্রী বাজারের বড় অংশ পেতে দেশি ও বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। এই অবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক লিজ রেটে উপযুক্ত উড়োজাহাজ নিশ্চিত করা বিমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
লিজ নিয়ে ১০টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার এই প্রস্তাব বিমানকে বর্তমান সময়ের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা যোগাবে। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্মের নতুন উড়োজাহাজ আসার আগ পর্যন্ত বিমান বর্তমান সেবা শক্তিশালী করতে এবং নতুন রুট চালু করতে পারবে।