শিরোনাম

মো. জহির উদ্দিন বাবর
ঢাকা, ১৯ জুলাই, ২০২৬ (বাসস): সমৃদ্ধ, দারিদ্র্যমুক্ত ও কল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিকদের বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান সম্প্রতি রাজধানীতে তার কার্যালয়ে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয়, অবদানভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পেনশন সংস্কৃতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে সরকারি চাকরিজীবীদের বাইরে অধিকাংশ মানুষের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমানে দেশের কর্মক্ষম নাগরিক, বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম সামাজিক সুরক্ষাকে প্রচলিত কল্যাণভিত্তিক ধারণা থেকে অবদানভিত্তিক ও টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তরের পথ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
সরকারি কর্মচারীদের প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থার সঙ্গে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের পার্থক্য তুলে ধরে ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, সরকারি পেনশন অ-অবদানভিত্তিক এবং কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রযোজ্য। অন্যদিকে সর্বজনীন পেনশন স্কিম অবদানভিত্তিক। এতে অংশগ্রহণকারীরা নিয়মিত চাঁদা জমা দিয়ে আজীবন মাসিক পেনশন সুবিধা পান।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করে ৪ কোটি মানুষকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।
তিনি বলেন, নিবন্ধন ও অংশগ্রহণ বাড়াতে ইতোমধ্যে ৪৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করা হয়েছে। পাশাপাশি বিকাশ, নগদ ও টেলিটকের মাধ্যমে চাঁদা জমা দেওয়ার সুবিধা চালু করা হয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, এনজিও এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় চারটি পৃথক কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এগুলো হলো- প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ‘প্রবাস’ স্কিম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মীদের জন্য ‘প্রগতি’ স্কিম, স্বকর্মে নিয়োজিত ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের (কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার ও তাঁতি) জন্য ‘সুরক্ষা’ স্কিম এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘সমতা’ স্কিম।
এর মধ্যে সমতা স্কিমে একজন গ্রাহক মাসে ৫০০ টাকা জমা দিলে সরকার সমপরিমাণ অর্থ যোগ করে মোট ১ হাজার টাকার চাঁদা নিশ্চিত করে। এছাড়া প্রগতি স্কিমে কর্মী ও নিয়োগকর্তা যৌথভাবে চাঁদা প্রদান করেন।
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের বিভিন্ন সুবিধার কথা তুলে ধরে ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, পেনশন তহবিল পরিচালনার প্রশাসনিক ব্যয় সরকার বহন করে। ফলে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা সরাসরি গ্রাহকের হিসাবে জমা হয়। মাসিক চাঁদার বিপরীতে কর রেয়াত এবং প্রাপ্ত পেনশনের ওপর আয়করমুক্ত সুবিধাও রয়েছে। এছাড়া ৬০ বছর পূর্তির পর পেনশন তহবিলের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এককালীন উত্তোলনের সুযোগ রয়েছে।
তহবিল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তিনি বলেন, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩ এবং সরকার অনুমোদিত বিনিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী বর্তমানে তহবিলের অর্থ নিরাপদ ও স্বল্প-ঝুঁকিপূর্ণ খাতে, বিশেষ করে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে তহবিলের আকার বাড়লে ঝুঁকি ও মুনাফার ভারসাম্য বিবেচনায় বিনিয়োগের ক্ষেত্র আরও বহুমুখী করা হবে।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ পদ্ধতির আওতায় ইসলামিক পেনশন স্কিম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় একজন আন্তর্জাতিক পরামর্শক শরিয়াহসম্মত কাঠামো ও বাস্তবায়ন কৌশল প্রণয়নের কাজ করছেন।
তিনি বলেন, ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের মধ্যে আস্থা ও সচেতনতা বাড়ানো। যেহেতু এটি একটি নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি, তাই অনেকেই এর সুফল সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি অবগত নন। আমরা বিশ্বাস করি, সময়ের সঙ্গে সফল বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা এবং নিয়মিত জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।’
দেশের কর্মক্ষম নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যত দ্রুত সম্ভব সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত হওয়া উচিত। অল্প অল্প করে নিয়মিত সঞ্চয়ই ভবিষ্যতের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলে।