বাসস
  ২০ মে ২০২৬, ১৬:৫৪

নারীর কাঁধে সচল অর্থনীতির চাকা

ঢাকা, ২০ মে, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশের মানচিত্রের প্রতিটি সুতায়, প্রতিটি ধানের শীষে এবং প্রতিটি ইটের ভাঁজে মিশে আছে নারীর শ্রম। হিমালয়সম প্রতিকূলতা জয় করে এদেশের নারীরা আজ অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। তৈরি পোশাক খাত থেকে শুরু করে উদয়াস্ত খাটুনি দেওয়া কৃষিক্ষেত, পাহাড়ের চা-বাগান, ধুলোবালির নির্মাণ সাইট কিংবা আইটি খাতের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ- সর্বত্রই নারীর পদচারণা অগ্রগতির প্রতীক। কিন্তু এই উজ্জ্বল চিত্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার অধ্যায়।

তথ্য ও পরিসংখ্যান বলছে, যে নারীর কাঁধে ভর করে অর্থনীতির চাকা ঘুরছে, সেই নারীই কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪.২ শতাংশ নারী। ২০১৭ সালে এই হারছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ। এই উল্লম্ফন ইতিবাচক মনে হলেও মুদ্রার উল্টোপিঠ অত্যন্ত করুণ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমবাজারে যুক্ত এই নারীদের ৯৬.৬ শতাংশই কাজ করেন ‘অনানুষ্ঠানিক’ বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। অর্থাৎ, বিশাল এই জনগোষ্ঠী শ্রম আইনের সুরক্ষা, পেনসন সুবিধা কিংবা চাকরির নিশ্চয়তা ছাড়াই দিনাতিপাত করছেন।

এক সময় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ৮০ শতাংশই ছিল নারী শ্রমিক। নব্বইয়ের দশকে গ্রাম থেকে আসা এই নারীরাই মূলত এ খাতের বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু বিজিএমইএ’র ২০২৪ সালের প্রতিবেদন ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির এমআইবি প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, এই হার বর্তমানে কমে ৫৩.৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

এর পেছনে কাজ করছে ‘অটোমেশন’ বা যন্ত্রনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা। প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব এবং ডিজিটাল ডিভাইস তাদের এই খাত থেকে ছিটকে দিচ্ছে।

রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকার শ্রমিক আয়েশা আক্তারের জীবন কাহিনী এই সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। আন্দোলনে যোগ দিয়ে চাকরি হারানো আয়েশা এখন আমিনবাজারের ইটভাটায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। তার ভাষায়, ‘গার্মেন্টসে বাচ্চা নিয়ে কাজ করার পরিবেশ নেই, বেতন বকেয়া থাকে। এখানে অন্তত মন চাইলে কাজ করি, না চাইলে করি না।

আয়েশার মতো হাজারো নারী এখন পোশাক খাত ছেড়ে অনিশ্চিত পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) পরিচালক কোহিনুর মাহমুদ মনে করেন, স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার বৃদ্ধি, যৌন হয়রানি ও মানসম্মত ডে-কেয়ার সেন্টারের অভাব নারীদের এই খাত বিমুখ করছে।

বাংলাদেশের শ্রম আইনে ‘সমান কাজের সমান মজুরি’র কথা বলা থাকলেও বাস্তবে সেটির প্রয়োগ নগণ্য। আইএলও (২০২৩)-এর তথ্যমতে, পোশাক শিল্পে একই পদের পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারীরা গড়ে ২১ শতাংশ কম মজুরি পান। কৃষিখাতে এই বৈষম্য আরও প্রকট, যেখানে নারী শ্রমিকেরা পুরুষের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম মজুরি পান।

চা-বাগানের চিত্র আরও শোচনীয়। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি’র নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার জানান, চা-বাগানের ৭০ শতাংশ শ্রমিক নারী হলেও তাদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৭০-১৮৫ টাকা। এই নাম মাত্র আয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সুবিধা পাওয়া তাদের জন্য আকাশ কুসুম কল্পনা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা এই ‘আধুনিক দাসত্বের’ শৃঙ্খলে বন্দি।

কর্মক্ষেত্রে নারীর জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাতৃত্বকালীন অধিকারের অভাব। মাঠ জরিপ অনুযায়ী, ৬৮ শতাংশ নারী শ্রমিক মনে করেন মাতৃত্বকালীন ছুটি নিলে তাদের চাকরি থাকবে না। মাত্র ৫-১০ শতাংশ কারখানায় কার্যকর ডে-কেয়ার সুবিধা আছে। ফলে একজন নারী যখনই সন্তানের জননী হন, তখনই তাকে কর্মক্ষেত্র বনাম মাতৃত্বের কঠিন লড়াইয়ে হার মানতে হয়। পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা না থাকায় অভিজ্ঞ নারী শ্রমিকেরা ক্যারিয়ারের মাঝপথে কাজ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

নির্মাণ শিল্পে দিনদিন নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু আইএলও ও বিজিএমইএ’র ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ নারী শ্রমিক কোনো ধরণের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম (পিপিই) পান না। অন্যদিকে সেবাখাত যেমন- হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিউটি পার্লারে দীর্ঘ সময় কাজ করলেও তাদের কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। ফলে তারা সবসময় ছাঁটাই আতঙ্কে থাকেন।

সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি’র নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন, ‘গার্মেন্টসে মজুরি বৈষম্য কিছুটা কমলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে নারীরা চরম বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। নেতৃত্বস্থানীয় পদে নারীদের উপস্থিতি মাত্র ৮-১০ শতাংশ হওয়ায় তাদের দাবিগুলো নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছায় না।

নারীর প্রতি এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি গভীর মানসিক ও সামাজিক সমস্যা। কৃষি জমির মালিকানায় নারীর অংশ মাত্র ১২ শতাংশ। কৃষিতে নারীর শ্রমকে ‘সহায়তাকারী শ্রম’ হিসেবে দেখে তার আর্থিক মূল্য কমিয়ে রাখা হয়। আবার ২০ লাখের বেশি গৃহকর্মী শ্রম আইনের বাইরে থাকায় তারা নূন্যতম মজুরি ও মর্যাদা হানির শিকার হচ্ছেন। শহরাঞ্চলে একজন গৃহকর্মীর গড় আয় ৭ হাজার টাকা, যা জাতীয় নূন্যতম মজুরির অর্ধেক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে হলে রাষ্ট্র ও মালিক পক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের (গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক) শ্রম আইনের আওতায় এনে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অটোমেশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নারীদের জন্য বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

এছাড়া শিল্প এলাকায় সরকারি উদ্যোগে আবাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিকেএমইএ’র পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনের মতে, রাষ্ট্র এই দায়িত্ব নিলে মালিকদের পক্ষে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা সহজ হবে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও যে ধরনের সহযোগিতা করা দরকার আমরা তা করতে প্রস্তুত।

বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের জিডিপি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ নারীর ক্ষমতায়ন কেবল মানবাধিকারের প্রশ্ন নয়, এটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাবিকাঠি।

শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দীন আহমেদ যথার্থই বলেছেন, আমরা শহরের বিভিন্ন কাজে নারীদের আনছি, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা বা টেকসই আবাসের কথা ভাবছি না। এই অবহেলার অবসান হওয়া জরুরি। অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই নারী শ্রমিকদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার বুঝিয়ে দিলেই সার্থক হবে ‘উন্নয়নশীল বাংলাদেশ’ নামকরণটি। নতুবা বঞ্চনার এই অদৃশ্য দেয়াল একদিন পুরো অর্থনীতির গতিকেই রুদ্ধ করে দিতে পারে।