বাসস
  ০৯ মে ২০২৬, ২১:১২

শিশুরদের স্মার্টফোন আসক্তি কতটা ভয়ংকর

প্রতীকী ছবি। পেক্সেলস

ঢাকা, ১০ মে, ২০২৬ (বাসস) : ঢাকার বাসিন্দা রুবেল (ছদ্মনাম)। পেশায় আয়কর আইনজীবী। প্রথম সন্তানের বয়স আট। পরেরজনের বয়স তিন। প্রথম সন্তান সবকিছু স্বাভাবিকভাবে করছে- পড়াশোনা, ড্রইং, খেলাধুলা সবই নিয়ম মেনে করে। কখনো কখনো আবার দুষ্টুমি করে মায়ের বকাও শোনে। সংকট হলো পরেরজনকে নিয়ে। তিন বছরের মেয়েটি কথা বলে খুব কম। প্রথমদিকে তারা একে সহজভাবে নিলেও ধীরে ধীরে তাদের দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে। স্বামী-স্ত্রী প্রায়ই এটা নিয়ে ভাবেন, আলোচনা করেন, সমাধান খোঁজেন। 

শেষে নিজেরা সমাধান খুঁজে না পেয়ে শরণাপন্ন হন চিকিৎসকের। চিকিৎসক সব দেখে-শুনে তাকে একজন থেরাপিস্ট এবং চাইল্ড স্পেশালিস্টের সঙ্গে আলাপ করতে বলেন। চাইল্ড স্পেশালিস্ট অনেকক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, শিশুর দেরিতে কথা বলা বা স্পিচ ডিলে আছে। এই কারণে শিশু খুব কম কথা বলে। 

সারাক্ষণ মোবাইল দেখে।

রুবেল যেভাবে সন্তানের সমস্যা বুঝতে পেরেছেন, বাকি অভিভাবকেরা কি তা পারছেন? বেশিরভাগই পারছেন না, কারণ তাদের জানার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, আপনার সন্তান কি স্মার্টফোনে আসক্ত? প্রশ্নটা অবশ্য এভাবে না করে করা উচিত- আপনার সন্তান কেন স্মার্টফোনে আসক্ত?

স্মার্টফোনে আসক্তির বিষয়টি শুরুর দিকে আতঙ্কের পর্যায়ে থাকলেও এখন অনেকেই তা মেনে নিয়েছেন। 

সুস্পষ্ট করে বললে, অভিভাবকেরা মানতে বাধ্য হয়েছেন। তার কারণ অবশ্য অঢেল।

প্রথমে একটা বিষয় উল্লেখ করা জরুরি: স্মার্টফোন এখন জীবনযাপনের অংশ। তা হুট করে সরানোর কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু সেই স্মার্টফোন আপনার গোটা সময় কেড়ে নেবে, এটা স্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে তা অস্বাভাবিক।

করোনার আগে শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহারের পরিসর ছিল ক্ষুদ্র, করোনার পর তা বেড়েছে। প্রয়োজনে বেড়েছে। এখন সেই প্রয়োজনই সহজ-স্বাভাবিক আঙ্গিকে রূপ নিয়েছে। এই সহজ-স্বাভাবিক রূপের আড়ালে রয়েছে ভয়াবহতা। এর প্রতিকার অবশ্য আছে। প্রতিকার সম্ভবও। তা নির্ভর করছে ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও আগ্রহের ওপর। প্রশ্ন হলো, অভিভাবকেরা কি আসলে আগ্রহী?

২০২৪ সালে বাংলাদেশে শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রি-স্কুল শিশু স্মার্টফোনে আসক্ত। এদের মধ্যে ২৯ শতাংশের মারাত্মক স্মার্টফোন আসক্তি রয়েছে। অন্যদিকে মাত্র ১৪ শতাংশ শিশু অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার করে। আরও দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন মায়ের ৪ জনই সন্তানের স্মার্টফোন আসক্তি সম্পর্কে অবগত নন।

জানতে চেয়েছিলাম, আপনার সন্তান কেন স্মার্টফোনে আসক্ত? এর উত্তর গবেষণার মধ্যেই আছে। গবেষণা বলছে, ১৪ শতাংশ শিশু অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার করে। এই ১৪ শতাংশ শিশু বা তাদের অভিভাবকেরা পেরেছেন স্মার্টফোনকে শুধুমাত্র অধ্যয়ন বাদে অন্য কাজে ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে। 

তারা স্মার্টফোন ব্যবহারকে আসক্তির পর্যায়ে নিতে দেননি। নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন।

আবার যে ২৯ শতাংশ শিশুর স্মার্টফোনে আসক্তি মারাত্মক, তারা তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। তারা ধীরে ধীরে বিভিন্ন কার্যকলাপের মাধ্যমে এই আসক্তি দূর করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন শিশুদের মনোযোগ অন্যত্র স্থানান্তর করা। এটা সহজ কাজ নয়। কিন্তু সম্ভব। তা সময়, শ্রম ও ধৈর্যসাপেক্ষ।

প্রসঙ্গ হলো, এখনকার অভিভাবকেরা অনেক বেশি কর্মমুখর। যৌথ পরিবারের ধারণা ভেঙে একক পরিবার বেড়েছে। ফলে অভিভাবকদের বাড়তি কোনো লোক থাকছে না। অল্প মানুষ দিয়ে স্বল্প সময়ে তাদের অনেক কিছু করতে হয়। ইচ্ছা থাকলেও সবসময় তারা পেরে ওঠেন না। তখন শিশু বাধ্য হয়ে স্মার্টফোনকে আপন ভেবে নেয়।

এরপরের বিষয় হলো, অনিরাপদ পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। মোটাদাগে বলতে গেলে, শিশুরা অনিরাপদ। তারা পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষক, এমনকি দূরের আত্মীয় কারও কাছে নিরাপদ নয়। প্রতিদিনের গণমাধ্যমের অসংখ্য প্রতিবেদন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এর ফলে শিশু একাকী সময় কাটানোর জন্য স্মার্টফোনকে আপন ভাবছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খেলার পরিবেশ ক্ষীণ হওয়া এবং পার্ক ও খেলার মাঠের স্বল্পতা। নগরায়ন বা দ্রুত বর্ধনশীল আবাসনে খেলার মাঠ বা পার্ক অবহেলিত এক প্রকল্পের নাম। যারা নগরায়ন তৈরি করে, তাদের চোখে পার্ক বা মাঠ হলো অলাভজনক বিষয়। আবার পুরোনো যেসব মাঠ বা পার্ক আছে, তাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর করতলে। ফলে শিশুরা মাঠ বা পার্ক না পেয়ে স্মার্টফোনে আসক্ত হচ্ছে।

এই সংকটগুলোর সমাধান সম্ভব, যদি রাষ্ট্র চায়। এখন রাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাল আর চিন্তার মধ্যে তো আর শিশুদের ফেলে রাখা যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য বিভিন্ন কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটি চালু রাখতে হবে।

শিশু যখন তার মনোযোগ অন্য কোনো কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটির মধ্যে দেবে, তখন স্মার্টফোন আসক্তি ধীরে ধীরে কমে আসবে। এখন প্রশ্ন হলো, কী ধরনের কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটি তার সঙ্গে করা হবে, বা কী ধরনের কার্যকলাপের মধ্যে শিশুকে ব্যস্ত রাখা হবে?

শিশুর বয়স নির্ধারণ করে, সেই বয়স অনুযায়ী তার কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটি নির্ধারণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ড্রইং, খেলাধুলা, গান, নাচ, আবৃত্তি, যন্ত্রসংগীত, অভিনয়, সাইক্লিং, সুইমিং, আর্টওয়ার্ক, ভাষা শেখানো, মার্শাল আর্ট শেখা, পরিচয়পর্ব (গাছ, ফুল, পাখি, সবজি, ফলমূল চেনানো), মাটি বা ক্লে বা ডো দিয়ে বিভিন্ন কিছু তৈরি করা, শিশুপার্কে নিয়ে যাওয়া, চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া, গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটানোসহ অসংখ্য বিষয়ের সঙ্গে শিশুদের পরিচয় ঘটানো সম্ভব।
এক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তারা শত ব্যস্ততার মধ্যেও শিশুদের নিয়ে এইসব কাজ করাতে পারেন।

এছাড়া শহর বা নগরে বিভিন্ন ধরনের প্রি-স্কুল, কেয়ার সেন্টার চালু আছে। তা অবশ্য ব্যয়সাপেক্ষ। এসব প্রি-স্কুল বা কেয়ার সেন্টারে শিশুদের ব্যস্ত রাখতে অনেক ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অভিভাবকেরা প্রি-স্কুল বা কেয়ার সেন্টার যাচাই-বাছাই করে শিশুদের যুক্ত করতে পারেন।

সবার সামর্থ্য সমান নয়। যাদের সামর্থ্য স্বল্প, সেসব অভিভাবকেরা শিশুদের সময় দিয়ে তাদের বন্ধু হতে পারেন। তারা কী চায়, তা বুঝে সেই অনুযায়ী কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা সাজাতে পারেন। 

এক্ষেত্রে প্যারেন্টিংয়ের গাইডলাইন ভালো সহযোগী হবে।

এর ফলে যা হবে, তা হলো স্মার্টফোনে আসক্ত শিশুদের তাৎক্ষণিকভাবে আসক্তি থেকে দূরে সরানো সম্ভব নয়, কিন্তু ধীরে ধীরে তা দূর করা সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে সর্বক্ষণ যুক্ত থাকতে হবে। এতে করে শিশুরা 
অনেক বেশি কর্মমুখর বা প্লেফুল হয়ে উঠবে।

লেখা শেষ করছি একটা চলচ্চিত্রের ঘটনা বলে।

ভারতের বাংলা ভাষার একটি চলচ্চিত্র ‘হাবিজাবি’। এটি মুক্তি পায়২০২২ সালে। গল্পটা এরকম—স্বামী-স্ত্রী দুজনই ব্যস্ত। ছেলেকে সময় দেওয়ার সময় তারা পান না। ছেলে নিজের একাকীত্ব কাটানোর জন্য স্মার্টফোনকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। ধীরে ধীরে তার আসক্তি বাড়তে থাকে। সেই আসক্তি প্রবল আকার ধারণ করে। অনলাইনে গেম খেলতে খেলতে সে এমনভাবে নেশায় ডুবে যায় যে, সবসময় স্মার্টফোন হাতে বসে থাকে। তার হাত থেকে স্মার্টফোন সরানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

স্মার্টফোন হাত থেকে সরানো নিয়ে বাবার সঙ্গে ঝগড়া বাঁধলে ছেলে অনলাইন গেমে বাবাকে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবতে থাকে। একসময় স্বামী-স্ত্রী বুঝতে পারে, তাদের সন্তান আসলে অনেক বেশি মাত্রায় স্মার্টফোনে আসক্ত। এ থেকে তারা তাদের সন্তানকে বের করতে পারছে না। এভাবে স্মার্টফোন আসক্তির ভয়াবহ কুফল দেখানো হয়, দেখানো হয় সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন কতটা জরুরি।

চলচ্চিত্রে অনেক ছোট ছোট বিষয় দারুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং এই বার্তা দেওয়া হয়েছে- শিশুদের পারিবারিক বন্ধন থেকে আলাদা করার সুযোগ নেই। এই বন্ধন আলগা হলেই শিশুর যেকোনো ক্ষতিকর বিষয়ের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি এবং খেয়াল রাখা জরুরি, যাতে করে তাদের শিশু অন্যত্র বা অন্য কোনো ক্ষতিকর বিষয়ে আসক্ত না হয়।