বাসস
  ০৯ মে ২০২৬, ১৫:৫৬

হাল না ছাড়ার গল্প : সংকট পেরিয়ে স্বপ্নার নতুন পথচলা

ঢাকা, ৯ মে, ২০২৬ (বাসস): ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক সাধারণ গৃহিণীর জীবনও যে একদিন সংগ্রাম আর সাহসের অসাধারণ গল্প হয়ে উঠতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ নাসরিন নওরোজ স্বপ্না। তিন মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট সংসার, স্বামীর উপার্জনে মোটামুটি স্বচ্ছল জীবনযাপন। সব মিলিয়ে সুখেই কাটছিল দিনগুলো।

কিন্তু ২০২০ সালের করোনা মহামারি তাদের জীবনের গতিপথ পুরো বদলে দেয়। শুরু হয় জীবনের নতুন সংগ্রাম। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কঠিন সংগ্রাম!

চারদিকে তখন করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার খবর। এর মধ্যেই হঠাৎ জানা গেল, স্বপ্নার স্বামীর জিহ্বায় ক্যানসার। চিকিৎসকদের কঠিন সিদ্ধান্ত— জিহ্বার এক-তৃতীয়াংশ কেটে ফেলতে হবে। চিকিৎসার খরচ ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। এমন খবর যেকোনো পরিবারের জন্যই ভীতিকর কিন্তু সীমিত আয়ের এই পরিবারের জন্য তা ছিল প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ।

স্বপ্না বলেন, সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল যেন সবকিছু থেমে গেছে। কোথা থেকে এত টাকা আসবে, কীভাবে চিকিৎসা চলবে— কোনো উত্তর ছিল না তার।

স্বামীর চিকিৎসা চালাতে গিয়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, এমনকি পরিচিত-অপরিচিত সবার কাছেই সাহায্যের হাত বাড়াতে হয়েছে। নিজের সঞ্চয়, গয়না— যা ছিল সব বিক্রি করে দিতে হয়েছে। অফিস থেকেও কিছু অর্থ সহায়তা নেওয়া হয়।

এ সময় পরিবারের আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা ছিল তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ। বড় মেয়ে তখন এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর ছোট দুই মেয়ে পড়ছে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। এমন সংকটময় সময়ে সন্তানদের সামলানোও ছিল কঠিন।

স্বপ্না জানান, করোনার কারণে তাকে সন্তানদের বোনের বাসায় রেখে স্বামীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। অর্থাভাবে কেবিন নেওয়া সম্ভব হয়নি। পুরুষ ওয়ার্ডেই স্বামীর পাশে থাকতে হয়েছে তাকে। একটি বেডের পায়ের কাছে রাত কাটানো, অপরিচিত পরিবেশে অনিদ্রা— সবকিছু মিলিয়ে সেই সময়টা ছিল ভয়াবহ কষ্টের।

তিনি আরো বলেন, ‘হাসপাতালের দেওয়া খাবার দুজনে ভাগ করে খাওয়া, অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করা— এসবই যেন তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল।’

দীর্ঘ চিকিৎসার পর স্বামীকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেও পরিস্থিতি সহজ হয়নি। বরং সামনে আসে নতুন বাস্তবতা। স্বামী আর আগের মতো কথা বলতে পারেন না, কাজ করার ক্ষমতাও সীমিত। সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে স্বপ্নার কাঁধে।

তখনই তিনি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেন— শখের রান্নাকে পেশা বানাবেন। স্বপ্নার ভাষ্য, যেই কথা সেই কাজ। আর ধৈর্য ও শ্রম দিয়ে কাজটি করে গেছি।

আগে মাঝে মাঝে নিজের আনন্দের জন্য রান্না করলেও এবার তা হয়ে ওঠে আয়ের একমাত্র ভরসা। অনলাইনে খাবার বিক্রি শুরু করেন স্বপ্না। শুরুটা সহজ ছিল না— কখনো অর্ডার আসে, কখনো আসে না। তবু তিনি হাল ছাড়েননি।

এদিকে বড় মেয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি শুরু করে। ছোট দুই মেয়েও পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করছে। পরিবারের সবাই যেন নিজেদের জায়গা থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে বিভিন্ন মেলায় খাবার নিয়ে স্বপ্না অংশ নিতে শুরু করেন। কিন্তু সেখান থেকেও তেমন লাভ হচ্ছিল না। তবু তিনি থেমে যাননি। কারণ আমার সামনে ছিল তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ আর অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার দায়িত্ব, যোগ করেন তিনি।

সংগ্রামের এই পথে হঠাৎ করেই আসে এক বড় সুযোগ। তানজিনা নাহিদ, নাসরিন সিকদার হেনা ও আইরিন— এই তিন শুভাকাঙ্ক্ষী স্বপ্নার পাশে দাঁড়ান। তারা তাকে একটি ক্যাফে চালানোর সুযোগ করে দেন।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তাদের একটি আউটলেটের ভেতরে একটি রুম, কিচেন ও ওয়াশরুম ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়। শুধু জায়গাই নয়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড়, প্রচার, পরামর্শ— সবকিছুতেই সহযোগিতা করেন তারা।

স্বপ্নার হাতে তখন কোনো পুঁজি ছিল না। ক্যাফে খোলার সাহসও ছিল না। কিন্তু অন্যদের সহযোগিতাই তাকে নতুন করে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। স্বপ্নার মতে, আমার ছিলো পরিশ্রম করার মানসিকতা আর ধৈর্য।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেন স্বপ্না। নিজের হাতে রান্না করা বিভিন্ন খাবার এখন নিয়মিত সরবরাহ করেন। তার আয়েই এখন চলে সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা চলছে, স্বামীর চিকিৎসাও থেমে নেই।

তার বড় মেয়ে এখন হোম ইকোনমিকস কলেজে ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগে পড়ছে— মায়ের পথেই যেন এগিয়ে যাচ্ছে। ছোট দুই মেয়েও এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

স্বপ্নার জীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়— সংকট যত বড়ই হোক, হাল না ছাড়লে পথ একদিন খুলবেই। তার গল্প শুধু ব্যক্তিগত সংগ্রামের নয়, এটি সাহস, অধ্যবসায় এবং মানবিক সহায়তার এক অনন্য উদাহরণ। নতুনদের উদ্দেশ্যে এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, এখন আমি সফল ব্যবসায়ী হওয়ায় অনেকেই আমাকে সম্মান দেয়। কিন্তু কঠিন সময়ে সবাইকে সেভাবে কাছে পাইনি। নিজে নিজেই এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে। তাই যারা উদ্যোক্তা হতে চায়- তাদের বলবো সঠিক লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। একদিন সাফল্য আসবেই।

নারী উদ্যোক্তা নাসরিন নওরোজ স্বপ্নার নামের সামগ্রিক অর্থ ‘নতুন দিনের সুন্দর স্বপ্ন’। জীবনের প্রয়োজনে তিনি পরিশ্রম আর ধৈর্য দিয়ে নিজের নামের মতো জীবনকেও অর্থবহ করে তুলেছেন। তাই স্বপ্নার এগিয়ে যাওয়ার গল্পটি শুধু অনুপ্রেরণার নয়, বরং আমাদের সমাজের মানবিক দিকটিও তুলে ধরে।

কঠিন সময়ে কিছু মানুষের আন্তরিক সহায়তা একটি পরিবারের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে— নারীরা সুযোগ পেলে শুধু নিজেদের নয়, পুরো পরিবারকে টেনে তুলতে পারেন। স্বপ্নার মতো মানুষেরা আমাদের শেখান, জীবন যতই কঠিন হোক, চেষ্টা আর ধৈর্য থাকলে নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব।