শিরোনাম

চট্টগ্রাম, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : দুঃসহ স্মৃতি জাগানিয়া ভয়াল ২৯ এপ্রিল আজ। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ইতিহাসে এক ভয়াল দিন। ১৯৯১ সালের এই দিনে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার পুরো উপকূলজুড়ে তাণ্ডব চালায়।
ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে এ দিন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চল পরিণত হয় এক মৃত্যু উপত্যকায়। ঝড়টি সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল।
সেদিন প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হন প্রায় এক কোটি মানুষ।
প্রলয়ঙ্করী ওই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলেও, সেই বিভীষিকার স্মৃতি আজও কাঁদায় চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের।
এই ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ‘ম্যারি এন’ নামে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হেনেছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও নোয়াখালীসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার পুরো উপকূল। ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলবাসী আজও ভুলতে পারছে না সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি।
এ সব উপকূলীয় এলাকার কিছু অংশে নির্মিত হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ। এসব এলাকার বেশির ভাগ বেড়িবাঁধ পুরোনো ও দুর্বল। বেড়িবাঁধের অনেক স্থানই ভেঙে গেছে।

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে মৃতের সংখ্যা বিচারে পৃথিবীর ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে অন্যতম।
১৯৯১ সালের এ দিনে প্রলয়ঙ্ককরী ঘূর্ণিঝড় চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার (১৫৫ মাইল/ঘণ্টা) বেগে আঘাত হানে। এ ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ছয় মিটার (২০ ফুট) উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হয়।
সরকারি হিসাবে ওই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারান ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪২ জন।
বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। তাদের বেশিরভাগেরই মৃত্যু হয় চট্টগ্রাম জেলার উপকূল ও দ্বীপগুলোতে। সন্দ্বীপ, মহেশখালী ও হাতীয়া দ্বীপে মৃতের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক।
এর মধ্যে শুধু সন্দ্বীপে প্রাণ হারান প্রায় ২৩ হাজার লোক। মারা যায় প্রায় ২০ লাখ গবাদিপশু। প্রায় ১০ লাখ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গৃহহারা হয় লাখো মানুষ। ধ্বংস হয় কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ।
বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে দেখেছিল প্রকৃতির সেই নির্মম তাণ্ডব। শোক আর স্তব্ধতায় ডুবে গিয়েছিল পুরো দেশ।
ঘুর্ণিঝড়ে কর্ণফুলি নদীর তীরে কংক্রিটের বাঁধ ধ্বংস হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের ১০০ টন ওজনের একটি ক্রেন ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে স্থানচ্যুত হয় এবং টুকরো টুকরো হয়ে যায়। বন্দরে নোঙর করা বিভিন্ন ছোট বড় জাহাজ, লঞ্চ ও অন্যান্য জলযান নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অনেক যানও ছিল।
স্থলভাগে আঘাত হানার পর, ঝড়ের গতিবেগ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং ৩০ এপ্রিল ঝড়টি নিষ্ক্রিয় হয়।
ওই ঘূর্ণিঝড়ে বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের মধুখালী গ্রামের বাসিন্দা শওকত আরা বেগম (৫৭) হারিয়েছেন তার তিন ছেলেমেয়েসহ দশ স্বজনকে।
সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় তছনছ করে দিয়েছিল গৃহবধূ শওকত আরার পুরো সংসার। তিন দশকের বেশি সময় ধরে সেই দুর্বিষহ স্মৃতি নিয়ে দিন কাটে তার।
আজও খুঁজে পাননি ঘূর্ণিঝড়ে হারিয়ে যাওয়া তার তিন সন্তানের লাশও।

শওকত আরা বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় শব্দটি শুনলেই আমার বুকে কম্পন শুরু হয়, এই বুঝি আবারও সব কেড়ে নিচ্ছে সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড়। ছেলেমেয়েদের বাঁচাতে গিয়ে আমিও পানিতে ডুবতে বসেছিলাম। তখন স্বজনদের কেউ একজন আমাকে বাঁচিয়েছে।’
সেদিন চোখের সামনে নিজের ভাই ও নিজ গ্রামের ১৫০ মানুষের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে ৭৫ বছর বয়সী আনোয়ারা উপজেলার রায়পুরের আবুল কাশেম বলেন, কারো কল্পনায়ও ছিল না যে এমন কিছু ঘটবে। ঘূর্ণিঝড় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই আমার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। কিন্তু মধ্যরাতে বাতাসের বেগে আমার ঘর ভেঙে যায়, সেখানেই চাপা পড়ে মারা যায় প্রায় এক’শ মানুষ। আমার ছোট ভাইসহ তার পুরো পরিবারও সেদিন মারা যায়।
এদিকে আজ (বুধবার) কক্সবাজার-চট্টগ্রামসহ উপকূলীয় এলাকায় সেই দিনের ভয়াল স্মৃতির স্মরণে দোয়া মাহফিল ও খতমে কোরআনের আয়োজন করা হয়।
টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে র্যালি-মানববন্ধন করে স্বজনদের স্মরণ করছে মানুষ।
দিবসটি স্মরণে পৃথক দোয়া ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে উপকুলীয় উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, সন্দ্বীপ সমিতি, পতেঙ্গা সমাজ বিরোধী প্রতিরোধ কমিটি, চট্টগ্রামের আনোয়ারা সমিতি ও কুতুবদিয়া সমিতি।