বাসস
  ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৮

‘বিগত দুই সরকারের আমলে টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে’

ছবি: সংগৃহীত

\ মলয় কুমার দত্ত \

ঢাকা, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : সারাদেশে হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের পেছনে পূর্ববর্তী দুই সরকারের আমলে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ঘাটতির বিষয়টি সামনে এসেছে। বর্তমানে দেশের ৫৮ জেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দেশজুড়ে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম চালাচ্ছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া। লকডাউন, সরবরাহ সংকট এবং টিকা নিতে অনীহার কারণে অনেক পরিবার শিশুদের নির্ধারিত ডোজ দিতে পারেনি।

শিশু রোগ ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেগম শারিফুন নাহার বলেন, আমরা এখন সেই ঘাটতির পরিণতি দেখছি। যেসব শিশুর এখনও টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি, তাদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।

হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় সরকার ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর সহযোগিতায় ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে বৃহত্তর কর্মসূচির আওতায় সারাদেশের ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী সকল শিশুকে টিকার আওতায় আনার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে ছড়ায় এবং বাতাসে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই এটি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।

চিকিৎসকরা জানান, সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়া। শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, যা সাধারণত কানের পেছন থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা ছাড়াই হাম সেরে যায়। তবে গুরুতর সংক্রমণে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, অন্ধত্ব এবং কানে সংক্রমণ হতে পারে।

ডা. শারিফুন নাহার বলেন, ‘শ্বাসকষ্ট একটি গুরুতর সতর্ক সংকেত।’ শিশুদের মধ্যে উপসর্গ বেড়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

অপুষ্টির শিকার শিশুরা গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। পুষ্টিহীনতা এবং বিলম্বিত টিকাদান শিশুদের এই স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান সূচি অনুযায়ী, শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা অতিরিক্ত ডোজ গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে একটি ডোজ থেকে অন্যটির ব্যবধান অন্তত এক মাস রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

টিকাদানের পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা (আইসোলেশন), মাস্ক ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে সংক্রমণ না ছড়ায়।

হামের চিকিৎসায় মূলত সহায়ক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্টেশন, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য খাবার স্যালাইন। তবে পরিস্থিতি গুরুতর হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশজুড়ে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতিও জোরদার করা হয়েছে।

হামের এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে অভিভাবকদের অসচেতনতা ও ভুল তথ্যকেও দায়ী করেছেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সামিরা ইসলাম নিশা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের এই ইনডোর মেডিকেল অফিসার বলেন, কিছু অভিভাবক সময়মতো শিশুদের টিকা দিচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ অমূলক ভয় বা গুজবে বিশ্বাস করে টিকাদান থেকে বিরত থাকছেন।

তিনি বলেন, হাম শিশুদের মধ্যে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং সময়মতো টিকা দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ‘টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং বহু বছর ধরে পরীক্ষিত।’

জাতীয় টিকাদান সূচি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি শুধু নিজের সন্তানকেই সুরক্ষিত করে না, পুরো সমাজকেও সুরক্ষিত করে।’

তিনি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন এবং ভুয়া তথ্য প্রতিরোধ ও টিকা গ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করতে স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম ও কমিউনিটিকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

এদিকে, গত ২০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অতীতে টিকাদানে অনিয়মের কারণেই সংক্রমণ বেড়েছে।

তিনি বলেন, অতীতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি হামের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ব্যর্থতা দেশজুড়ে হাম নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

তবে মন্ত্রী জানান, পরিস্থিতি এখনো মহামারির পর্যায়ে পৌঁছায়নি এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রয়োজন নেই।

তিনি আরও বলেন, ইউনিসেফ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় টিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে এগিয়ে চলছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অনিয়মিত স্তন্যদানের বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে। পুষ্টিহীনতার কারণে অনেক শিশু হামসহ বিভিন্ন রোগে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। এ ঘাটতি পূরণে ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘কেবল ওষুধ দিয়ে শিশুদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’ মায়েদেরকে শিশুদের সঠিক পুষ্টি ও যত্নে আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। তারা অভিভাবকদের সময়মতো টিকা দেওয়ার এবং উপসর্গ বেড়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কাছে এ রোগ প্রতিরোধের উপায় রয়েছে। এখন লক্ষ্য হলো সংক্রমিত হওয়ার আগেই প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গে অন্তত ২২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।