বাসস
  ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৮
আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৪

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নারীর ভূমিকা

প্রতীকী ছবি

ঢাকা, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : ঘরে ঢুকেই রাফিয়ার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়-ঘরের সবগুলো বাতি জ্বালানো। এ যেন বিয়ে বাড়ি। চিৎকার করে ডাকেন কাচের বুয়াকে-অকারণে এতগুলো বাতি জ্বালানোর কারণ জিজ্ঞেস করেন। জবাবে বুয়া জানায়, সে শুধু রান্নাঘর আর ডাইনিংয়ের বাতি জ্বালিয়েছে। বাকি ঘরের বাতি জ্বালিয়েছে হাফিজ। রাফিয়ার ৮ বছরের ছেলে হাফিজ। কাপড় বদল করে হাতমুখ ধুয়ে চা খেতে খেতে ছেলেকে কাছে ডাকেন রাফিয়া। ‘বাবা, তুমি কি জান যে, বিদ্যুতের অভাবে কত ভাইয়া, আপু সন্ধ্যার পর ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারে না, কত মানুষ গরমে কষ্ট পায়, কত কলকারখানা ঠিকমত চলতে পারছে না, কত কৃষক জমিতে ঠিকমত পানি দিতে পারে না। আর তুমি কোনো কারণ ছাড়া এতগুলো বাতি ও ফ্যান চালিয়ে বিদ্যুৎ নষ্ট করছ-এটা কি ঠিক?’

কী বলবে বুঝতে পারে না হাফিজ। ছেলেকে বিদ্যুৎ সমস্যার কথা বুঝিয়ে রাফিয়া বলে, তোমার মতো সবাই যদি একটু একটু করেও বিদ্যুৎ নষ্ট করে, তবে সবারটা মিলে বিশাল পরিমাণ বিদ্যুতের ঘাটতি হবে। আর যদি আমরা  বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে পারি, তবে সবাই এর উপকার পাবে।

রাফিয়া চাকরিজীবী। সারাদিন বাসায় থাকেন না। তাই সংসারের ভালোমন্দের ব্যাপারে কাজের লোকের উপর নির্ভর করতে হয়। শুধু ছেলে মেয়েকে নয়, বাসার কাজের লোককেও রাফিয়া বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। ঘরের সবাইকে এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, কাজ শেষে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে অবশ্যই ফ্যান, লাইটের সুইচ বন্ধ করতে হবে।
 
রাফিয়া নিজেও বাসা এবং অফিস উভয় ক্ষেত্রেই এ ব্যাপারে অতি সাবধান থাকেন। ফ্যান, লাইট ছাড়াও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাফিয়ার। আসলে বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক সামগ্রী বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষেরা ক্রয় করে থাকলেও এগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে নারীদের উপর। তাই মা-বোনদের সতর্কতার উপরে নির্ভর করে কতটুকু বিদ্যুৎ অপচয় হবে, বা সাশ্রয় হবে।
 
আজকাল অর্থনৈতিকভাবে সামান্য সচ্ছল এমন পরিবারেও ফ্রিজ থাকে। আর ধনী পরিবারে তো দু’তিনটি ফ্রিজ রাখা কোনো ব্যাপারই না। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোট বিদ্যুৎ খরচের বড় একটি অংশ যায় ফ্রিজ ব্যবহারে। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য ফ্রিজটি ঘরের এমন স্থানে রাখতে হবে যেখানে সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে। এর ফলে ফ্রিজটি যে পরিমাণ তাপ উৎপন্ন করে তা বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে। তবে সরাসরি সূর্যের আলো বা রোদ যাতে না পড়ে অথবা চুলার বা ওভেনের কাছাকাছি যাতে ফ্রিজ না রাখা হয়, তা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। ফ্রিজের চারপাশে কয়েক ইঞ্চি করে জায়গা খালি রাখতে হবে। বরফ বোঝাই ফ্রিজ চলতে শক্তি খরচ হয় বেশি। তাই ফ্রিজে বেশি বরফ জমে গেলে সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে। ফ্রিজের তাপমাত্রাও প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনের বেশি খরচের অর্থই হলো বেশি বিদ্যুৎ খরচ। অনেকে ফ্রিজ থেকে জিনিসপত্র বের করার জন্য কয়েক মিনিট পর্যন্ত ফ্রিজের দরজা খুলে রাখে। এতে ফ্রিজের ভেতরের ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে সহজেই গরম হয়ে ওঠে ভেতরের তাপমাত্রা।
 
এ গরমকে ঠান্ডা করতে খরচ হয় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ। কখনোই কোনো গরম খাবার বা বস্তু ফ্রিজে ঢোকানো যাবে না। কারণ, গরম খাবারকে ঠান্ডা করতে এবং একে ঠান্ডা রাখতে ফ্রিজের করতে হয় অধিক পরিশ্রম এবং অধিক শ্রম যে অধিক শক্তি দাবি করে তাতো বলাই বাহুল্য। সুতরাং খাবার রান্নার পর সম্পূর্ণরূপে ঠান্ডা করে তবেই তা ফ্রিজে ঢোকানো উচিত। বরফকৃত মাছ, মাংস সাধারণত বাইরে রেখে বা পানিতে ভিজিয়ে বরফ ছাড়ানো হয়। এ ক্ষেত্রে মাছ-মাংস রান্নার আগের দিনই যদি ফ্রিজের স্বাভাবিক অংশে রেখে বরফ ছড়ানো হয়, তবে এতে করে ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচ যেমন কম হবে, তেমনি খাদ্য দ্রব্যের মান ও স্বাদ বজায় থাকবে।

কাজের লোকের অভাবে অনেক বাসায় ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধোয়া হয়। যদিও এর জন্য বিদ্যুৎ ব্যয় খুবই বেশি। তবে এ যন্ত্রটি ব্যবহারের কিছু কৌশল বিদ্যুৎ ভোগের পরিমাণ কমাতে পারে। কাপড় ধোয়ার যন্ত্র চালনার জন্য ব্যবহৃত মোট বিদ্যুতের শতকরা ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ ব্যয় হয় এর ভেতরকার পানি গরম করতে। কম তাপমাত্রার পানিতে কাপড় ধুয়ে মোট খরচের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়। আমাদের দেশে রোদ প্রচুর, তাই মেশিনে কাপড় না শুকিয়ে রোদে বা বাইরের বাতাসে কাপড় শুকানো হলে বাড়তি বিদ্যুৎ খরচের হাত থেকে রেহাই পাবেন।

রিমোটের যুগে আমরা রিমোট কন্ট্রোলে বোতাম টিপে টেলিভিশন, রেডিও বা সিডি প্লেয়ার বন্ধ করলেও মূল বোতামটি চেপে যন্ত্রটি বন্ধ করি না। এমনকি বৈদ্যুতিক সংযোগকারী সুইচটিও বন্ধ করি না। এতে করে যন্ত্রটির সাথে বৈদ্যুতিক সংযোগ থাকায় যন্ত্রটি চালু অবস্থায় যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করে, স্ট্যান্ডবাই অবস্থায় থাকায় এর শতকরা ৮৫ ভাগ বিদ্যুৎ খরচ হয়। সুতরাং যখন আমরা টিভি দেখা বা রেডিও, সিডি প্লেয়ার শোনা শেষ করব তখনই যেন সংযোগকারী বৈদ্যুতিক সুইচটিও বন্ধ করি। একই কথা কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক ওভেন ইত্যাদির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

গৃহস্থালির মোট বিদ্যুৎ খরচের শতকরা ১০ থেকে ১২ ভাগ হলো বাতি খরচ। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাল্ব ব্যবহার উপকারী। এ ধরনের বাল্বের মূল্য একটু  বেশি হলেও, প্রচলিত বৈদ্যুতিক বাতির চেয়ে এ বাল্ব ১০ গুণ বেশি সময় টিকে এবং ৪ ভাগের এক ভাগ বিদ্যুৎ খরচ করে। স্বাভাবিক বাতির ক্ষেত্রে আপনার যদি ১০০ ওয়াট প্রয়োজন হয়, এনার্জি সেভিং বাল্বেও ক্ষেত্রে মাত্র ২০-২৫ ওয়াটই যথেষ্ট হবে। তবে মূল কথা হলো, যে ধরনের বাতিই আপনি ব্যবহার করেন না কেন, কক্ষ ত্যাগের আগে ঐ কক্ষের বাতি এবং সেই সাথে ফ্যানের সুইচও বন্ধ করবেন এবং বিনা কারণে বারান্দার বাতিও জ্বালিয়ে রাখবেন না। আর ঘরের বাইরের রাস্তা বা বাগানে যত কম বাতি জ্বালানো যায়, ততই আপনার বিদ্যুৎ ব্যয় কমবে। এছাড়া আজকাল বাগানে ব্যবহারের জন্য সোলার গার্ডেন লাইট পাওয়া যায়। এ ধরনের বাতির জন্য আলাদা কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ প্রয়োজন হয় না। এর মধ্যস্থিত বৈদ্যুতিক কোষের সাহায্যে দিনের বেলা সৌরশক্তিকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে এবং রাতে আলো দেয়।
 
বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এয়ার কন্ডিশনার ও বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বলা যায়, পাখা দিয়ে যদি কাজ হয়, তবে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করা উচিত নয়। উদাহরণস্বরূপ : একটি বৈদ্যুতিক পাখায় যদি ঘণ্টায় ৩০ পয়সা বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় সেখানে একটি এয়ার কন্ডিশনার চালাতে লাগবে ঘণ্টায় ১০ টাকা। একান্তই যদি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রটি চালাতে হয়, তবে মনে রাখবেন, ২২ ডিগ্রির উপরে তাপমাত্রা রাখলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় শতকরা ৩ থেকে ৫ ভাগ। সেজন্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রে থার্মোস্ট্যাট ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা যেমন আরামদায়ক, তেমনি সাশ্রয়ীও। আর বৈদ্যুতিক পাখার ক্ষেত্রে ধাতব ব্লেডের পরিবর্তে ফাইবার ব্লেড ব্যবহার করলে শতকরা ২০ ভাগ বিদ্যুৎ খরচ কমে।
 
ঘরের জানালার কাচে বিভিন্ন রং, বিশেষ করে পশ্চিম দিকের জানালার কাচে সবুজ রঙের নেট বা জাল লাগালে তা সূর্য রশ্মিও সরাসরি প্রবেশে বাধা দেয়। অন্যদিকে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের দরজা, জানালার ফাঁক ফোকর বন্ধ এবং জানালার কাচে বিভিন্ন রঙের প্রলেপের সাহায্যে ঘরের ঠান্ডা হাওয়া বাইরে যেতে বাধা দেওয়া হলে এয়ার কন্ডিশনারের উপর চাপ পড়ে কম এবং এ খাতে বিদ্যুৎ খরচ হয় শতকরা ৪০ ভাগ কম।
 
এ বিষয়ে রাফিয়া বলেন,বিদ্যুৎ ব্যবহারে গৃহকর্তা হিসাবে আপনার নিজের সতর্কতাই যথেষ্ট নয়। বরং এক্ষেত্রে পরিবারের সকলের সচেতনতা ও সহযোগিতা প্রয়োজন। তাই সচেতন করুন আপনার কর্তা, সন্তান, কাজের লোক, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে। 

একজন নারী হিসাবে আপনার একটু সচেতনতা ও সতর্কতা একদিকে আপনার বিদ্যুৎ বিল কমাতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, সকল নারীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে তা বড় আকারে অবদান রাখতে সহায়তা করবে। মনে রাখবেন, বিদ্যুতের এ সংকটময় মুহূর্তে আপনার সামান্য একটু উদ্যোগ আপনার সন্তানকে দেবে বৈদ্যুতিক আলোতে সারা সন্ধ্যা পড়ার সুযোগ, সার রাত বৈদ্যুতিক বাতাসে ঘুমানোর নিশ্চয়তা, আপনার দেশের কৃষিক্ষেত্রে ও কল কারখানায় দেবে অবিরাম বৈদ্যুতিক সরবরাহ। সুতরাং আর নয় বিদ্যুৎ অপচয়’ সবাই সচেতন হই।