শিরোনাম

ঝালকাঠি, ২১ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। নানা প্রতিকূলতা ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে কর্মক্ষেত্রগুলোতে অংশ গ্রহণ ও উদ্যোক্তা হিসেবে অনেক নারী এখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। নিজেদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি অন্য নারীদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন তারা।
ঝালকাঠির নারী উদ্যোক্তা কল্পনা রানীর (৪০) গল্পও তেমনই এক অনুপ্রেরণার উদাহরণ। মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ঘরে বসে কাগজের প্যাকেট তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ২০ বছরের পরিশ্রম, ধৈর্য আর সাহসিকতায় সেই ছোট উদ্যোগই এখন প্রায় কোটি টাকার প্যাকেজিং ব্যবসায় রূপ নিয়েছে।
কল্পনা রানীর সঙ্গে আলাপকালে জানান, প্রায় দুই দশক আগে সংসারের অভাব-অনটন দূর করার চিন্তা থেকেই তিনি এই উদ্যোগ শুরু করেন শহরের বাহের রোডে। শুরুতে কোনো বড় পুঁজি ছিল না। স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা দিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। তখন নিজের ঘরেই হাতে তৈরি করতেন কাগজের মিষ্টির প্যাকেট।
তিনি জানান, ‘শুরুর সময়টা খুব কঠিন ছিল। বাসায় বসে প্যাকেট বানাতাম, তারপর নিজেই দোকানে দোকানে ঘুরে বিক্রি করতাম। তখন কেউ ভাবত না এই কাজ করে বড় কিছু করা সম্ভব। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি।’
কল্পনা রানীর স্বামী বিমল দেবনাথ শুরু থেকেই তাকে সহযোগিতা করেছেন। স্বামীর সেই সমর্থন ও উৎসাহ তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে বলে জানান তিনি।
ধীরে ধীরে তার কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। এখন ঝালকাঠি শহরের কলেজ রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘স্বর্ণা প্যাকেজিং’ নামে একটি ছোট প্যাকেজিং কারখানা।
এ প্রতিষ্ঠানে মূলত বিভিন্ন ধরনের কাগজের প্যাকেট তৈরি করা হয়, যা বিরিয়ানি, মিষ্টি ও বিভিন্ন খাবার প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়। তার তৈরি প্যাকেট শুধু ঝালকাঠির চার উপজেলাতেই নয়, বরগুনার বামনা ও বেতাগী, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া ও নৈকাঠি এলাকার বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এসব প্যাকেট নিয়মিত যায়।
কল্পনা রানী জানান, কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত কাগজ বরিশাল ও ঢাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই কাগজ তার কারখানায় একটি কাটিং মেশিন এবং একটি রোলার মেশিন ব্যবহার করে প্যাকেটগুলো তৈরি করা হয়। বাজারে এসব প্যাকেট ৪ টাকা থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়।
তার কারখানায় বর্তমানে ১১ জন নারী ও ৩ জন পুরুষ শ্রমিক কাজ করেন। কর্মরত নারীদের প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা করে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। এদের মধ্যে দুইজন তালাকপ্রাপ্ত নারী রয়েছেন।

কল্পনা রানী বলেন, ‘আমরা যে ভাড়া বাড়িতে কাজ করি সেটা নিচু জায়গায়। বৃষ্টি হলে পানি ঢুকে যায়। আধুনিক মেশিনের অভাবেও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহায়তা তিনি পাননি। ব্যবসার জন্য মূলত বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে। তাই তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বিসিক শিল্প এলাকায় একটি প্লট পাওয়ার আশা প্রকাশ করেন।
কল্পনা রানীর প্রতিষ্ঠানের কর্মী মিতালি রানী বলেন,‘ আমিও বিবাহিত জীবনে এখন নেই, বাবার বাড়িতে থাকি। আমাদের মতো অনেক নারীর জন্য এই কাজটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্যাকেট বানিয়ে কিছু আয় হয়। আমরা কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছি।’
টিআইবি কতৃক পরিচালিত সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর সদস্য কবিতা হালদার বলেন, ‘আমি অনেক দিন ধরেই কল্পনা রানীর এই উদ্যোগের কথা জানি এবং তার কাজ কাছ থেকে দেখেছি। কল্পনা রানীর মতো নারী উদ্যোক্তারা সমাজের অন্য নারীদেরও স্বাবলম্বী হওয়ার সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।’
জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা দিলারা খানম বলেন, ‘কল্পনা রানী প্রমাণ করে দিচ্ছেন, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে নারীরাও সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন। ভবিষ্যতে তিনি যদি কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ বা সহযোগিতা চান, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক) জেলা কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক আল আমিন বাসস কে বলেন, ‘বিসিক শিল্প এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্লট বরাদ্দের সুযোগ রয়েছে। যোগ্য উদ্যোক্তারা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে তা যাচাই-বাছাই করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কল্পনা রানীর মতো উদ্যোক্তারা আবেদন করলে বিসিকের নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে বিসিক বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে থাকে।’