শিরোনাম

ঢাকা, ২০ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : ভোর হলেই একসময় আম্বিয়া খাতুনের দিনের শুরু হতো এক কঠিন দুশ্চিন্তা দিয়ে—আজ খাওয়ার পানিটা কোথা থেকে আনা যাবে? খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের এই গৃহিণীর জীবনে নিরাপদ পানির অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে দূরবর্তী উৎস থেকে পানি আনতে হতো তাকে।
কখনো পুকুরের অনিরাপদ পানিই ছিল একমাত্র ভরসা। বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে কষ্ট যেন চরমে পৌঁছাতো, পুকুর শুকিয়ে যেত, পানির উৎস কমে আসত, আর রান্নার মতো মৌলিক কাজও হয়ে উঠত দুষ্কর।
স্মৃতিচারণ করে আম্বিয়া খাতুন বলেন, এমন দিনও গেছে যখন পানির অভাবে রান্না করা সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করে পানি আনতে গিয়ে শরীর ভেঙে পড়ত, অসুস্থ হয়ে পড়তেন মাঝেমধ্যে।
তার এই কষ্টের প্রভাব পড়ত পুরো পরিবারের ওপর। তবে সময় বদলেছে। এখন তার বাড়ির উঠানেই রয়েছে দুই হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ট্যাংক। সেই ট্যাংকের পানি ব্যবহার করে সারা বছর নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণ করতে পারছেন তিনি।
এই পরিবর্তন শুধু আম্বিয়ার জীবনেই নয়, তার সময় ব্যবহারের ধরনেও বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে যেখানে দিনের বড় অংশ চলে যেত পানি সংগ্রহে, এখন সেই সময় তিনি ব্যয় করছেন নিজের ও পরিবারের যত্নে, পাশাপাশি আয়মূলক কাজে। ২০২১ সালে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি নিজেই শুরু করেন সবজি উৎপাদন। বর্তমানে তার উঠানে লাউ, লালশাক, মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজি চাষ হচ্ছে। এতে একদিকে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত সবজি বিক্রি করে আয়ও করছেন তিনি।
আম্বিয়ার এই গল্প একক কোনো ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের বহু নারীর জীবনের প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট একটি বড় সমস্যা। নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব—সব মিলিয়ে নিরাপদ পানি পাওয়া এখানে কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে পরিবারের পানির দায়িত্ব বহন করতে গিয়ে নারীদেরই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলের অনেক এলাকায় পানির উৎসে লবণাক্ততার মাত্রা জাতীয় মানের চেয়ে অনেক বেশি। অনেক জায়গায় টিউবওয়েল ও পুকুরের পানিতে ধাতব উপাদানও পাওয়া গেছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপদ পানির এই সংকট শুধু দৈনন্দিন জীবনে কষ্ট বাড়ায় না, বরং স্বাস্থ্যঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় বাংলাদেশের পানি পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বছরে গড়ে প্রায় সাড়ে ৪ মাস নিরাপদ পানির অভাব থাকে। কিছু এলাকায় এই সংকট সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়। একই গবেষণায় উঠে এসেছে, মাত্র ১৬ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব পানির উৎস রয়েছে। ফলে অধিকাংশ মানুষকে বাইরের উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব পড়ে নারীদের ওপর। প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব নারীদের ওপরই বর্তায়। দূরবর্তী উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের শারীরিক পরিশ্রম বাড়ে, সময় অপচয় হয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা ইউনিয়নের পূর্ণিমা রানী দে এই বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তিনি একাই থাকেন। প্রতিদিন প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে পানি আনতে হতো তাকে। অসুস্থ অবস্থায়ও বিকল্প না থাকায় পুকুরের অনিরাপদ পানি পান করতে বাধ্য হতেন, যার ফলে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বহুবার।
তবে এখন তার জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ট্যাংক। বললেন, এখন আর দূরে যেতে হয় না; নিজের বাড়িতেই পাচ্ছি নিরাপদ পানি। এতে তার স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন কমেছে, তেমনি সাশ্রয় হচ্ছে সময়ও। সেই সময় কাজে লাগিয়ে তিনিও শুরু করেছেন বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ। উৎপাদিত সবজি দিয়ে নিজের খাদ্য চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কিছু আয়ও করছেন।
উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানি ও জীবিকায়নের এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একটি সমন্বিত উদ্যোগ। এই উদ্যোগের আওতায় ইতিমধ্যে শত শত পাড়াভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে এবং হাজারের বেশি নারীকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে জীবিকায়ন দল। এসব দল নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে বাজার বিশ্লেষণ, আর্থিক পরিকল্পনা, উৎপাদন কৌশল এবং দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয় নিয়ে কাজ করছে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু সহনশীল জীবিকায়ন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ, হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে কৃষি, কাঁকড়া ও তিল চাষ, নার্সারি গড়ে তোলা, মাছ ও কাঁকড়ার খাদ্য উৎপাদন এবং অ্যাকুয়াজিওপনিক পদ্ধতিতে মাছ ও সবজি চাষ। বিশেষ করে হাইড্রোপনিক পদ্ধতি লবণাক্ত এলাকার জন্য অত্যন্ত কার্যকর, কারণ এতে মাটির প্রয়োজন হয় না এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় সহজে চাষ স্থানান্তর করা যায়।
খুলনার কয়রা উপজেলার বাগালী ইউনিয়নের ঘুগরাকাটি গ্রামের মাকসুদা খাতুনের জীবনেও এই প্রকল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। একসময় লবণাক্ত মাটি ও পানির কারণে তার সবজি চাষ ও পশুপালন ব্যর্থ হয়েছিল। স্বামী পরিত্যক্ত এই নারী তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন। কিন্তু প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার পর তিনি এখন একজন সফল উদ্যোক্তা ও দলনেত্রী।
তিনি ‘গোলাপ’ নামে ২৬ সদস্যের একটি নারী জীবিকায়ন দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই দলের মাধ্যমে তারা শিখেছেন আধুনিক কৃষি ও উৎপাদন পদ্ধতি। এখন শুধু নিজের জীবিকা নয়, অন্য নারীদেরও আত্মনির্ভর হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন তিনি।
আলাপচারিতায় মাকসুদা বলেন, নিরাপদ পানি ও প্রশিক্ষণ তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। সময় বাঁচানো এবং উৎপাদনমূলক কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভূমিহীন ও দরিদ্র নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা। দলভিত্তিক জমি ইজারার মাধ্যমে তারাও এখন কৃষি উৎপাদনে অংশ নিতে পারছেন। এতে শুধু আয় বৃদ্ধি নয়, সামাজিক মর্যাদাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নারীদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারীকে এক কিলোমিটারের বেশি দূর থেকে পানি আনতে হয়, তাদের মধ্যে প্রজননস্বাস্থ্যজনিত সমস্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর তুলনায় যাদের কাছে পানির উৎস রয়েছে, তাদের মধ্যে এই সমস্যা কম।
অর্থাৎ নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা মানে শুধু পানির কষ্ট দূর করা নয়, বরং স্বাস্থ্য, পুষ্টি, অর্থনীতি এবং সামাজিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত উপকূলীয় বাংলাদেশের জন্য প্রতিবেশ ভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং প্রমাণ ভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপের জরুরি প্রয়োজনের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, এই অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে বাঁধগুলো দ্রুত মেরামত করতে হবে এবং পানির উৎসগুলো ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি সমন্বিত উদ্যোগও জরুরি।
এই সমন্বিত উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০২৫ সালে একটি বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বের ২০টি উদ্ভাবনী উদ্যোগের মধ্যে উপকূলীয় এই প্রকল্পটি বিশেষ সম্মাননা অর্জন করে। এটি প্রমাণ করে যে স্থানীয় পর্যায়ের কার্যকর উদ্যোগ কীভাবে বৈশ্বিক গুরুত্ব পেতে পারে।
উপকূলের নারীদের জীবনের এই পরিবর্তনের গল্প আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরে—সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও নারীকেন্দ্রিক উদ্যোগ একত্রে বাস্তবায়ন করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাও সম্ভব।
আম্বিয়া, পূর্ণিমা কিংবা মাকসুদার গল্প আসলে একই সুরে বাঁধা—কষ্ট থেকে সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা তাদের জীবনে শুধু স্বস্তি এনে দেয়নি, বরং খুলে দিয়েছে আত্মনির্ভরতার নতুন দরজা।