বাসস
  ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:৫৮

সবজি বিক্রির টাকাতেই জীবনের চাকা ঘোরে তাদের

প্রতীকী ছবি

ঢাকা, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : জীবন-জীবিকার তাগিদে গ্রাম থেকে মানুষ ছুটে আসছে রাজধানী ঢাকায়। চাকুরির সন্ধানে  কেবল শিক্ষিত ছেলেমেয়েরাই নয় গ্রামের নিরক্ষর, দরিদ্র পরিবারের নারীরাও ছুটে আসছেন এ শহরে, জীবনের চাকা সচল রাখতে। 

তেমনই একজন শেরপুরের ৩৫ বছর বয়সী জোবেদা বেগম। পরিবারের খরচ মেটাতে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছেন তিনি। চটের বস্তা বিছিয়ে ‘ভাগা’ করে করে মিষ্টি আলু নিয়ে বসেছেন জোবেদা। চলছে ক্রেতার সঙ্গে দর কষাকষি। শেষে এক ভাগা আলু ১৫ টাকায় বিক্রি করলেন তিনি। এভাবে দিনে তার তিনশ’ থেকে চারশো টাকা রোজগার হয়।

জোবেদা বসেছেন দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি কাঁচাবাজার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে। তার গ্রামের বাড়ি শেরপুরে। শুধু তিনি একা নন। তার ভাষ্যমতে, কারওয়ান বাজারে শতাধিক নারী সবজিসহ নানা পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন, সংসার চালান।

এক সন্ধ্যায় জোবেদাসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। ক্রেতা বিদায়ের ফাঁকে ফাঁকে কথা বলেন তারা। তাদের বেশির ভাগ বসেন কাঁচা বাজার ও কারওয়ান বাজার সুপার মার্কেটের মাঝখানের খোলা জায়গায়। এ ছাড়া চটের বস্তায় করে নানাজন বাজারের নানা দিকে বসেন। তাদের বসার স্থায়ী জায়গা নেই। যখন যেখানে সুযোগ-সুবিধা পান সেখানে বসেন।

জোবেদা বলেন, নয়-দশ বছর বয়স থেকে কারওয়ান বাজারে এভাবে নানা পণ্য বিক্রি করে জীবিকা চালাচ্ছেন তিনি। আগে বাবা-মার সংসারে টাকা দিতেন। বিয়ের পর স্বামীর সংসারে। স্বামী গ্রামের বাড়িতে কামলা দেন। তাতে পাঁচজনের সংসার চলে না। 

জোবেদা বেগম থাকেন কারওয়ান বাজারের পাশেই রেললাইন সংলগ্ন বস্তিতে। বড় দোকানিদের কাছ থেকে পাইকারি দামে একেক দিন একেক পণ্য কেনেন তিনি। তারপর সেগুলো ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন। এভাবে নিজে কষ্ট করে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয় তাকে। তার পাঠানো টাকাতেই বাড়িতে পড়ালেখা করে বড় মেয়েটা এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ছোটোরাও বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়ছে।

জোবেদা জানান, কয়েক বছর আগে এভাবে জমানো টাকা দিয়ে এখানকার একটি সমিতির সদস্য হয়েছিলেন। সেখানে তার ৩৫ হাজার টাকা জমেছিল। এত কষ্টের জমানো টাকা নিয়ে একদিন সমিতির ক্যাশিয়ারসহ সকলে পালিয়ে গেছে।

প্রায় একই রকম গল্প বরিশালের রেহানা বেগমের। তার বয়স প্রায় ৪০ বছর। তিনি বসেছেন লাউ, মিষ্টি কুমড়াসহ নানান পদের সবজি নিয়ে। 

তিনি জানান, নদী ভাঙনে সব হারিয়ে তারা ঢাকায় এসেছেন। দুই ছেলে-মেয়ে। স্বামী কারওয়ান বাজারেই মাছের আড়তে কাজ করেন। থাকেন মগবাজার গাবতলা গলিতে।

রেহানা বেগম বলেন, লাউ-কুমড়া বিক্রি করে আয় খারাপ হয় না। দিনে প্রায় সাত-আটশ’ টাকা রোজগার করি। এভাবে মাসে প্রায় বিশ হাজার টাকা আয় হয়। 

তিনি জানান, ছোট ছেলে-মেয়ে দুটি মগবাজারের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। কষ্ট করে হলেও তাদের মানুষ করতে চান তিনি।

লালমনিরহাটের রেখা আক্তারের বয়স প্রায় ৫০ বছর। স্বামী মারা গেছেন। তিনি বসেছেন টমেটো, মরিচ, পেঁয়াজ-এগুলো নিয়ে। ক্রেতা কম দাম বলায় এক পর্যায়ে খেপে যান তিনি। বলেন, অনেক কষ্ট করে জীবন চলে তাদের। দাম কম বলার একটা সীমা আছে। এরকম করলে অনেক সময় মাথা ঠিক থাকে না তার।

রেখা আক্তার বলেন, তার স্বামী মারা গেছেন দশ বছর হলো। দুই ছেলে-মেয়ে। বড় ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকে। মেয়েকে নিয়ে সংসার তার। তিনি ঢাকায় এসেছেন আট-দশ বছর বয়সে। এরপর আর কখনোই স্থায়ীভাবে বাড়ি যাওয়া হয়নি তার। মাঝে-মধ্যে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার ইচ্ছে করলেও মনকে বশ মানান। সেখানে গিয়ে খাবেন কী করে?

এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় নারী নেত্রী সীমা মোসলেমের সাথে। তিনি বলেন, এসব নারীর বেশির ভাগের জীবনই কষ্টের, সংগ্রামের। এত কষ্টের মাঝেও রোজগার করা এবং সংসার চালানো খুবই ইতিবাচক দিক। এর ফলে তাদের দারিদ্র্য কিছুটা হলেও লাঘব হচ্ছে। এভাবে দেশে দারিদ্র্যের হার সামান্য হলেও কমছে। তাদের এ শ্রম জাতীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। তবে তারা যদি আরেকটু সহযোগিতা পেত তাহলে জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের অবদান আরো বেড়ে যেতো। তাদের দরকার থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও ব্যবসার নিশ্চয়তা।