শিরোনাম

ঢাকা, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : বেগম রোকেয়া বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের পথিকৃৎ। তিনি ছিলেন আজীবন সংগ্রামী এক নারী। তাঁর সংগ্রামী জীবনের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই যেন আজ বিউটি আক্তার তাঁর পায়রাবন্দের সফল নারী উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে পেয়েছেন সাফল্য, হয়েছেন হস্তশিল্পের দোকানের মালিক।
বিউটি আক্তারের বাল্যকালেই বিয়ে হয়। বাল্যবিবাহের পর দিন যতই গড়ায়, যৌতুকের চাপ ততই বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে চলে মানসিক নির্যাতনও। এর মধ্যে কোলজুড়ে আসে একটি কন্যাসন্তান। তারপরও সংসার টেকেনি। দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে চলে আসতে বাধ্য হন বাবার ভিটায়।
কিন্তু তিনি ভাইয়ের সংসারে বোঝা হয়ে থাকতে চাননি, এর চেয়ে বরং তিনি নিজেই কিছু করার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তা হিসেবে সফলতার দেখা পেয়েছেন বিউটি আক্তার। হয়ে উঠেছেন হস্তশিল্পের দোকানের মালিক। ২৯ বছর বয়সী বিউটির বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের খোর্দ মুরাদপুরে।
পায়রাবন্দের খোর্দ মুরাদপুর গ্রামেই ‘বেগম রোকেয়া হ্যান্ডিক্রাফটস’ নামে দোকান। দোকানে এখন লক্ষাধিক টাকার মালামাল রয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ওয়ালম্যাট, ডাইনিং ম্যাট, পাপোশ, শিশুদের খেলনা ও শতরঞ্জি। বিক্রি ভালো। পর্যটকেরা বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান পায়রাবন্দে ঘুরতে এসে এসব পণ্য কিনে থাকেন।
বিউটি জানান, ছোটবেলা থেকেই অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হয়েছেন। একবেলা খাবার জুটলে অন্যবেলা উপোস থাকতে হতো। তার ওপর বাবা নেই। ভাইয়ের সংসারে বড় হয়েছেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ২০০৪ সালে রংপুর নগরীর এক যুবকের সঙ্গে বিয়ে হয়। গায়ের রং ফর্সা না হওয়ায় বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন অসন্তুষ্ট ছিলেন। নানা ধরনের বিরূপ মন্তব্যও করতেন। প্রতিনিয়ত যৌতুকের জন্য চাপ দিতেন। বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসতে বাধ্য করার চেষ্টা চলত। কিন্তু সেই টাকা দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না তার পরিবারের। ফলে সেই সংসার বেশিদিন টেকেনি।
দুই বছরের কোলের শিশুকে নিয়ে ফিরে আসেন সেই গ্রামের বাড়িতে। বিউটির ফিরে আসাটা তার ভাইবোন খুব একটা ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। তবে বিউটি কারও বোঝা না হওয়ার কথা ভাবলেন। নিজেকে নিজের পায়ে ভর করেই বাঁচতেই হবে। সন্তানকেও লালন-পালন করে বড় করে তুলতে হবে। এত কষ্টের মধ্যেও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাসও করেন বিউটি।
বিউটি আরও জানান, সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে কাজের সন্ধানে পায়রাবন্দের রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির কাছে যান। গ্রামে তার একটি পাঠাগার আছে। ২০০৮ সালে পাঠাগারে পাঠকদের নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। বিনিময়ে মাত্র ৬০০ টাকা সম্মানী পেতে শুরু করেন। তা দিয়ে কোনোভাবে বাচ্চার খাওয়াদাওয়া চলত। ২০১৪ সাল পর্যন্ত সেই পাঠাগারেই কাজ করেন বিউটি।
২০১৫ সালে পায়রাবন্দের খোর্দ মুরাদপুর গ্রামের ‘বেগম রোকেয়া হ্যান্ডিক্রাফটস’ দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে চাকরি জোটে বিউটির। তিনি বলেন, মাস শেষে যে টাকা পেতেন, সেই টাকা দিয়ে মেয়ের লেখাপড়া চলতে থাকে। মেয়েটি এইচএসসি পাস করেছে।
ব্যবসা ভালো না হওয়ায় মালিক ২০১৯ সালে দোকানটি ছেড়ে দেন। সামান্য টাকার বিনিময়ে দোকানটি ভাড়া নেন বিউটি। একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেখানে নিজেই হস্তশিল্প পণ্যের দোকান নিয়ে বসেন। ব্যবসা ভালো হওয়ায় এখন সুখের মুখ দেখছেন বিউটি।
বিউটির এমন সংগ্রামী জীবন দেখে পায়রাবন্দে আরও অনেক নারী কর্মমুখী হয়ে উঠেছেন। তারাও ব্যবসা করছেন। কেউ শহর থেকে কাপড় কিনে এনে জামা বানিয়ে গ্রামের বাজারে বিক্রি করছেন। কেউ কাপড়ের দোকান দিয়েছেন। কেউবা হস্তশিল্পের পণ্য বানিয়ে গ্রাম ও শহরে বিক্রি করছেন।
রোকসানা নামের এক নারী বলেন, ‘বিউটি যদি পারেন, আমরা কেন পারব না? জামাকাপড় বানিয়ে পায়রাবন্দসহ এর আশেপাশের এলাকায় বিক্রি শুরু করেছি।’
স্থানীয় বাসিন্দা বেগম রোকেয়া স্মৃতি পাঠাগারের উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভূমিহীন পরিবারের সন্তান বিউটি। বাল্যবিবাহের পর যৌতুকের নির্যাতনে স্বামীর সংসার না হলেও বিউটি ঘুরে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পায়রাবন্দে এর চেয়ে বড় আর কী উদাহরণ হতে পারে।’