শিরোনাম

দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ
কুমিল্লা (দক্ষিণ), ১৩ এপ্রিল ২০২৬ (বাসস): বাংলা নববর্ষ মানেই উৎসব। আর সেই উৎসবের প্রাণ জুড়ে থাকে বাংলার লোকসংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ। মেলা, পান্তা-ইলিশ, নকশি কাঁথা কিংবা মুখোশের পাশাপাশি যে জিনিসটি গ্রামবাংলার চিরচেনা সুর হয়ে মানুষের হৃদয়ে বাজে, তা হলো বাঁশের বাঁশি। আর এই বাঁশির অন্যতম প্রধান উৎস কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম শ্রীমদ্দি। ‘বাঁশির গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত এই জনপদ এখন বৈশাখকে ঘিরে আবারও হয়ে উঠেছে প্রাণচঞ্চল।
মেঘনা নদীর তীর ঘেঁষা শ্রীমদ্দি গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন দৃশ্য। বাড়ির আঙিনায়, গাছের ছায়ায় কিংবা টিনশেড ঘরের সামনে বসে নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণ সবাই ব্যস্ত বাঁশি তৈরির কাজে। কোথাও কয়লার আগুনে লোহা গরম হচ্ছে, কোথাও নিপুণ হাতে বাঁশে ছিদ্র তৈরি করছে। আবার কোথাও রং-তুলির আঁচড়ে বাঁশি হয়ে উঠছে আরও আকর্ষণীয়। যেন পুরো গ্রামটাই এক বিশাল কারুশিল্প কর্মশালা।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এই গ্রামে বাঁশি তৈরির ঐতিহ্য চলে আসছে। বংশ পরম্পরায় পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা এই শিল্পই এখনো বহু পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। একসময় শ্রীমদ্দিতে শতাধিক পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে নানা প্রতিকূলতায় তা কমে গেছে। এই গ্রামে এখন ৫০ থেকে ৭০ টি পরিবার বাঁশি শিল্পের সাথে যুক্ত।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, এক সময় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে প্রায় প্রতিটি পরিবারই বাঁশি তৈরি করত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, পুঁজি সংকট, বাজারে অনিশ্চয়তা ইত্যাদি কারণে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।
শ্রীমদ্দির বাঁশি শিল্পের কথা বলতে গেলে যার নামটি প্রথমেই আসে, তিনি আবুল কাশেম। মাত্র ৯ বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে বাঁশি তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। সেই ছোট্ট ছেলেটিই আজ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঁশির সঙ্গে জীবন জড়িয়ে রেখেছেন।
অবসরে নিজের তৈরি বাঁশিতে সুর তুলতেন কাশেম। ধীরে ধীরে সেই সুরই হয়ে ওঠে তার জীবনের সঙ্গী। এখন তার হাতে তৈরি বাঁশি শুধু দেশের বিভিন্ন প্রান্তেই নয়, বিদেশেও সমান জনপ্রিয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, এই বাঁশিই আমাদের জীবন, আমাদের পরিচয়।
সারা বছর কিছুটা কাজ থাকলেও বৈশাখ এলেই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় শ্রীমদ্দি। পয়লা বৈশাখকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসে মেলা। আর সেই মেলার অন্যতম আকর্ষণ এই বাঁশি। ফলে বৈশাখের আগের মাসগুলোতে কারিগরদের দম ফেলার সময় থাকে না।
বাঁশির কারিগর যতীন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস জানান, বৈশাখ এলেই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন। প্রতিদিনই অর্ডার বাড়ে। এই সময়টাই আমাদের মূল আয়। শুধু দেশেই নয়, শ্রীমদ্দির বাঁশির কদর রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি এনজিও ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও যাচ্ছে এই বাঁশি।
শ্রীমদ্দির কারিগররা সাধারণত ১৪ থেকে ১৬ ধরনের বাঁশি তৈরি করেন। এর মধ্যে মোহন বাঁশি, নাগিনী বাঁশি, মুখ বাঁশি, আড় বাঁশি উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি বাঁশির আকার, সুর ও ব্যবহারে রয়েছে ভিন্নতা।
বাঁশি তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটিই বেশ শ্রমসাধ্য। প্রথমে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, সীতাকু- বা পার্বত্য অঞ্চল থেকে সরু মুলিবাঁশ সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই বাঁশ রোদে শুকানো হয়। শুকানোর পর নির্দিষ্ট মাপে কেটে মসৃণ করা হয়।
পরে গরম লোহা দিয়ে ছিদ্র করা হয়। সবশেষে রং ও নকশা দিয়ে বাজারজাত করা হয়। একটি বাঁশির দাম ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যা নির্ভর করে এর গুণগত মান ও ডিজাইনের ওপর।
এই শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। অনেক পরিবারেই দেখা যায়, পুরুষরা বাঁশ কাটা ও ছিদ্র করার কাজ করছেন। আর নারীরা রং করা, ডিজাইন করা ও প্রস্তুত বাঁশি গোছানোর কাজ করছেন। ফলে এটি শুধু একটি পেশা নয়, বরং পারিবারিকভাবে গড়ে ওঠা একটি শিল্প।
ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়ায়, কয়লার মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধিসহ সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে অনেক। অন্যদিকে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে প্রকৃত কারিগররা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না।
প্রবীণ কারিগর সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে বাঁশি বানাই, কিন্তু বাজারে গিয়ে ঠিকমতো দাম পাই না। আবার মেলায় নিতে গেলেও নানা ঝামেলায় পড়তে হয়। এছাড়া পুঁজি সংকটও বড়ো সমস্যা। অনেক কারিগর ঋণের বোঝা বইতে না পেরে এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে দক্ষ কারিগরের সংখ্যা।
তিনি বলেন, এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা, কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা হলে এই শিল্প নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
ঐতিহ্য কুমিল্লার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বাসসকে বলেন, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যদি যথাযথ সহায়তা ও পরিকল্পনা নেওয়া যায়, তাহলে শ্রীমদ্দির বাঁশি শুধু বৈশাখের মেলাতেই নয়, বিশ্বসংস্কৃতির মঞ্চেও আরও শক্তভাবে জায়গা করে নিতে পারবে।
হোমনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রীমদ্দির ঐতিহ্যবাহী বাঁশি শিল্প সম্পর্কে ইতোমধ্যে অবগত হয়েছি। এই এলাকার তৈরি বাঁশির চাহিদা দেশব্যাপী রয়েছে এবং তা বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। শিল্পটির বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিতভাবে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে কারিগরদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি আসন্ন বৈশাখি মেলায় তাদের জন্য স্টল বরাদ্দের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
কুমিল্লা বিসিক শিল্প নগরীর উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসির মামুন জানান, কুমিল্লার তৈরি বাঁশি বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাঁশি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারিগর ও উদ্যোক্তাদের সরকার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। কেউ বৃহৎ পরিসরে এই শিল্প নিয়ে কাজ করতে চাইলে বিসিকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তাও প্রদান করা হবে।