শিরোনাম

/ মো. মামুন ইসলাম/
রংপুর, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : দেশের উত্তরাঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের জন্য ভোটারদের চাহিদাকে সামনে রেখে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর জেলার ছয়টি আসনে প্রার্থীরা দুই থেকে তিনমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে পারেন।
এদিকে, ছয়টি আসনের প্রার্থীদের পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্যে ভোটের মাঠ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় নির্বাচনী প্রচারণা এখন তীব্রতর হয়েছে।
তিস্তা নদীর তীরে অবস্থিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই জেলায় বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)সহ ১৪টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের জন্য সাতজন স্বতন্ত্রসহ মোট ৪৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, দলীয় প্রভাব এবং অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের উপস্থিতি এই আসনগুলোতে বহুমুখী ও তীব্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কিছু আসনে বিএনপি, কিছু জায়গায় জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য আসনে জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপি শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
তবে ভোটাররা মনে করছেন, জেলার এই ছয়টি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে।
প্রার্থীরা ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহর, উপজেলা ও গ্রামে প্রতিশ্রুতির মালা নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন।
প্রচারণায় মাইক ও লাউডস্পিকারের শব্দে গোটা জেলায় এক ধরনের সঙ্গীতময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। চায়ের দোকান, বাসস্ট্যান্ড ও জনসমাগমস্থলে মানুষ প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা নিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করছেন।
প্রার্থীরা সভা, সেমিনার, উঠান বৈঠক ও জনসভায় মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
কেউ কেউ দুর্নীতিমুক্ত, কাঙ্ক্ষিত সংস্কার, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অধিকার ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
অন্যদিকে ভোটাররা অবহেলিত রংপুরের উন্নয়ন ও মৌলিক অধিকার পূরণের দাবি জানাচ্ছেন।
রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও রংপুর সিটির অংশ):
জাতীয় পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলীর দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় এখানে বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর ওপর প্রচারণা কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
বিএনপি প্রার্থী মোকাররম হোসেন সুজন এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী রায়হান সিরাজীর মধ্যে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই আসনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভোটাররা বলছেন, বিএনপির মোকাররম হোসেন সুজন (ধানের শীষ) জনপ্রিয়তার দিক থেকে এগিয়ে আছেন। জামায়াতে ইসলামীর রায়হান সিরাজী (দাঁড়িপল্লা) দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
স্থানীয় ভোটারদের চাওয়া তিস্তা মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন, স্থানীয় উন্নয়ন এবং অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে ঐক্যের রাজনীতির মাধ্যমে তৃণমূলে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
ইসলামী আন্দোলনের এটিএম গোলাম মুস্তফা (হাত পাখা), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) এর আহসানুল আরেফিন (কাঁচি) এবং ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মো. আনাম (চেয়ার) প্রতীক নিয়ে রংপুর-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৫ হাজার ২২৭ জন। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৫৭ জন ভোটার ডাক ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।
রংপুর-২ (বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ):
রংপুর-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর এ টি এম আজহারুল ইসলাম (দাঁড়িপল্লা), জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মণ্ডল (লাঙ্গল), বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলনের আশরাফ আলী (হাত পাখা) এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের আজিজুর রহমান (তারকা) পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভোটাররা এই আসনে বিএনপি, জামায়াত এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের হেভিওয়েট হিসেবে দেখছেন কারণ তাদের মধ্যে একজন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা এবং অন্য দুজন সাবেক সংসদ সদস্য।
এবার বিএনপির প্রার্থী এই আসনে আশার আলো দেখছেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ায়, এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী।
অন্যদিকে, ১১ দলীয় জোট সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এবং দলের নেতা-কর্মীদের বিশ্বাস এখানে জামায়াতের অবস্থান আগের চেয়ে শক্তিশালী।
শক্তিশালী তিন প্রার্থীই রংপুর-২ আসনে শ্যামপুর চিনিকল চালু, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এ আসনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বুন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর-২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮০ হাজার ৯২১ জন। এর মধ্যে ৩ হাজার ১১৬ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।
রংপুর-৩ (সদর ও রংপুর সিটির অংশ):
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ (সদর এবং রংপুর সিটির অংশ) আসনে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তারা হলেন: জাতীয় পার্টির জিএম কাদের (লাঙ্গল), বিএনপির মো. সামসুজ্জামান সামু (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মাহাবুবুর রহমান বেলাল (দাঁড়িপাল্লা), ইসামী আন্দোলনের আমিরুজ্জামান পিয়াল (হাত পাখা), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের আব্দুল কুদ্দুস (মই), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) এর আনোয়ার হোসেন বাবলু (কাঁচি), স্বতন্ত্র প্রার্থী রিতা রহমান (সূর্যমুখী) এবং তৃতীয় লিঙ্গের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী (হরিণ)।
এবার রংপুর-৩ আসনে গণভোটে 'না' ভোট দিয়ে দেশ বাঁচাও' স্লোগান নিয়ে প্রচারণায় ব্যস্ত জিএম কাদেরসহ জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা।
তিস্তা মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন এবং এই এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বিএনপি প্রার্থী শামসুজ্জামান সামু।
জামায়াতে ইসলামীর মাহাবুবুর রহমান বেলাল এবং ইসলামী আন্দোলনের আমিরুজ্জামান পিয়ালও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
মর্যাদাপূর্ণ রংপুর-৩ আসনটিকে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির ‘দুর্গ’ বলা হয়।
জুলাই আন্দোলনের পর দেশজুড়ে জাতীয় পার্টিকে ঘিরে যে বহুমুখী চাপ তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এবার জাতীয় পার্টির নেতারা জয়ের বিকল্প দেখছেন না।
এই কারণে, জিএম কাদেরসহ দলের নেতাকর্মীরা প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
এদিকে, রংপুর-৩ আসনে এই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেশের একমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী।
রংপুর-৩ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৮ হাজার ২২৪ জন। এর মধ্যে ৫ হাজার ২৩০ জন ভোটার ডাকযোগে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।
রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা):
রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তারা হলেন: বিএনপির প্রার্থী শিল্পপতি এমদাদুল হক ভরসা (ধানের শীষ), এনসিপির আখতার হোসেন (শাপলা কলি), জাতীয় পার্টির আবু নাসের শাহ মাহবুবর রহমান (লাঙল), ইসলামী আন্দোলনের জাহিদ হোসেন (হাত পাখা), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আবু সাহমা (রিকশা), বাংলাদেশ কংগ্রেসের উজ্জ্বল চন্দ্র রায় (ডাব), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) এর প্রগতি বর্মণ তমা (কাঁচি) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলম বাসার (হরিণ)।
এবার বিএনপির প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা তার জনপ্রিয়তা নিয়ে এই আসনটিতে জয়লাভ করতে মরিয়া। তিনি বিশ্বাস করেন, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা এই আসনে বিএনপির ধানের শীষের জয় নিশ্চিত।
এই আসনে, এনসিপির আখতার হোসেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী। জামায়াতে ইসলাম এবং পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলার তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের সমর্থনে নির্বাচনে জয়লাভের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী জুলাই আন্দোলনের অন্যতম এ নেতা।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু নাসের শাহ মাহবুবর রহমান এই আসনটি পুনরুদ্ধারের জন্য নির্বাচনী মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
এই আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৫ লাখ ৯ হাজার ৯০৬ জন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬৪৩ জন পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।
রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর):
রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আসনটিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় পার্টির মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর তিন প্রার্থীই নির্বাচনের জন্য জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীরা হলেন- জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী (দাঁড়িপাল্লা), বিএনপির অধ্যাপক গোলাম রব্বানী (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টির এসএম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, ইসলামী আন্দোলনের গোলজার হোসেন (হাতপাখা), নাগরিক ঐক্যের মোফাখকারুল ইসলাম নবাব (কেটলি), সিপিবির আবু হেলাল (কাস্তে), আমার বাংলাদেশ পার্টির আবদুল বাসেত (ঈগল), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) বাবুল আক্তার (কাঁচি) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের মাহবুবুর রহমান (ডাব)।
রংপুর-৫ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৯ হাজার ১৮৯ জন। এর মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন ৪ হাজার ৪৪৫ জন ভোটার।
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ):
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে এবার আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সাধারণ ভোটারদের ধারণা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই হবে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীরা হলেন: বিএনপির মো. সাইফুল ইসলাম (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা নুরুল আমিন (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির নূর আলম মিয়া (লাঙ্গল), আমার বাংলাদেশ পার্টির সাদেকুল ইসলাম (ঈগল), ইসলামী আন্দোলনের সুলতান মাহমুদ (হাত পাখা), স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু জাফর মো. জাহিদ (ঘোড়া), স্বতন্ত্র প্রার্থী খন্দকার শহীদুল ইসলাম (ফুটবল) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকিয়া জাহান চৌধুরী (সূর্যমুখী)।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩৫ জন। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৭৬ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।