শিরোনাম

ঢাকা, ৪ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : ইসরাইল বুধবার ভোরে ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ভেতরে প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে তারা আঘাত হেনেছে। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বিস্তৃত করেছে। তেহরান থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে মার্কিন নৌবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। উপসাগরে প্রবেশের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায়, মধ্যরাতের পর ইরানজুড়ে তারা বিস্তৃত হামলা চালিয়ে যায়। এর আগে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইরান ইসরাইলের দিকে তিন দফা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। তেল আবিবে এক নারী সামান্য আহত হন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, শনিবার ইসরাইলের সঙ্গে যৌথভাবে হামলা শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘এই বাহিনী বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে এসেছে। এক প্রজন্মের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ।’ তিনি দাবি করেন, প্রথম দিনের হামলা ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকে চালানো তথাকথিত ‘শক অ্যান্ড অ’ অভিযানের চেয়েও বড় ছিল।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটিতে ৭৮৭ জন নিহত হয়েছেন। তবে এএফপি স্বাধীনভাবে এ তথ্য যাচাই করতে পারেনি।
ইরান প্রতিশোধে বড় মূল্য আদায়ের অঙ্গীকার করেছে। দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেটের পাশের এলাকায় ড্রোন হামলায় আগুন লাগে, তবে হতাহতের কোনো খবর জানা যায়নি। কাতারের আল-উদেইদে মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলা হয়।
এর একদিন আগে রিয়াদ ও কুয়েত সিটিতে মার্কিন দূতাবাস ও বাহরাইনে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা হয়েছিল।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের জেনারেল ইব্রাহিম জব্বারি বলেন, ‘শত্রু যদি আমাদের প্রধান কেন্দ্রগুলোয় আঘাত হানে, আমরা অঞ্চলের সব অর্থনৈতিক কেন্দ্রে আঘাত করব।’
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলা শুরু করে। দুদিন আগে জেনেভায় পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে মার্কিন দূতদের সঙ্গে ইরানের আলোচনা চলছিল। হামলার পরপরই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।
ট্রাম্প বলেন, ইরান আবার আলোচনায় ফিরতে চায়, তবে এখন ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
হোয়াইট হাউসে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎসের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, হামলার সময় নির্ধারণ ইসরাইলের পরিকল্পনার কারণে হয়েছে—পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আগের দিনের এমন বক্তব্য থেকে তিনি সরে আসছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘বরং আমি হয়তো ইসরাইলকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছি।’
তিনি দাবি করেন, ইরানের নৌ, বিমান ও আকাশ নজরদারি ব্যবস্থাসহ প্রায় সবকিছুই ধ্বংস করা হয়েছে। সম্ভাব্য উত্তরসূরি নেতারাও নিহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘যাদের আমরা লক্ষ্যবস্তু করেছিলাম, তাদের বেশিরভাগই মৃত। এখন আরেকটি দল আছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তারাও হয়তো মৃত।’
ইরানি গণমাধ্যম জানায়, মঙ্গলবার পবিত্র নগরী কোমে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটির একটি ভবনে হামলা হয়েছে। তাসনিম বার্তা সংস্থা জানায়, এর আগের দিন তেহরানে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়েও হামলা হয়েছিল।
ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানিদের সরকারবিরোধী আন্দোলনে উঠে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ট্রাম্প বলেন, শাসন পরিবর্তন এ অভিযানের লক্ষ্য নয়।
কয়েক সপ্তাহ আগে ইরানি কর্তৃপক্ষ ব্যাপক বিক্ষোভ দমন করে। ওই বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হয়।
আঞ্চলিক এই যুদ্ধে লেবাননেও সহিংসতা বেড়েছে। তেহরানের দীর্ঘদিনের মিত্র সশস্ত্র শিয়া সংগঠন হিজবুল্লাহ খামেনির হত্যার প্রতিশোধে ইসরাইলের দিকে ড্রোন ও রকেট ছুড়েছে।
হিজবুল্লাহ জানায়, তারা উত্তরাঞ্চলীয় শহর হাইফায় ইসরাইলি নৌঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করেছে। ইসরাইল জানায়, তারা বৈরুতের দক্ষিণের শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় হামলা চালিয়েছে। বুধবার ভোরে জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
লেবানন সরকার জানিয়েছে, ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৫২ জন নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ বলেছে, ৩০ সহস্রাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইসরাইল জানায়, আগের যুদ্ধগুলোর মতো এবারও তারা সীমান্ত পেরিয়ে লেবাননের ভেতরে একটি বাফার জোন তৈরিতে সেনা মোতায়েন করছে।
তেহরানে প্রকাশিত ছবিতে মেহরাবাদ বিমানবন্দরে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। এখানে মূলত অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালিত হয়।
ইসরাইলি বাহিনী জানায়, তেহরানের পূর্ব উপকণ্ঠে একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলা হয়েছে। তাদের দাবি, সেখানে গোপনে পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিজ্ঞানীরা কাজ করছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলজুড়ে দূতাবাসগুলো থেকে জরুরি নয় এমন কর্মীদের সরিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, রিয়াদে ইরানি ড্রোন হামলায় সিআইএ স্টেশন লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
বাণিজ্যিক ফ্লাইট পাওয়া গেলে অঞ্চল ত্যাগে সব মার্কিন নাগরিককে উৎসাহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে আকাশপথে চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, প্রায় ৯ হাজার মার্কিন নাগরিক দেশে ফেরার পথ খুঁজে পেয়েছেন।
কাতার জানিয়েছে, দোহায় হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র তারা ভূপাতিত করেছে। ওমান জানিয়েছে, দুকম বন্দরে একাধিক ড্রোন হামলা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভূপাতিত একটি ড্রোনের
ধ্বংসাবশেষ পড়ে তেল সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিক এলাকায় আগুন লাগে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
তেহরানে যারা শহর ছাড়েননি, তারা মার্কিন-ইসরাইলি বোমাবর্ষণের ভয়ে ঘরে অবস্থান করছেন।
৩৩ বছর বয়সী নার্স সামিরেহ বলেন, সাধারণ সময়ে প্রায় ১ কোটি মানুষের বাস এই শহরে। তবে সাম্প্রতিক দিনে ‘এত কম মানুষ যে মনে হয় এখানে কেউ কখনও থাকেনি।’
কর্তৃপক্ষ আগেই শহর ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছিল। প্রধান সড়ক মোড়ে পুলিশ, সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন রয়েছে। যানবাহনে এলোমেলো তল্লাশি চলছে।
তেহরানের অভিজাত উত্তরাঞ্চলে যানজটের কোলাহলের বদলে শোনা যাচ্ছে শুধু বিড়ালের ডাক ও পাখির কলকাকলি।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানায়, যুদ্ধের প্রথম দিনে মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় ১৫০ জনের বেশি স্কুলছাত্রী নিহত
হয়েছে। তবে এএফপি ঘটনাস্থলে গিয়ে এ তথ্য বা পরিস্থিতি যাচাই করতে পারেনি।
মার্কিন সামরিক বাহিনী নিহত ছয় সেনার মধ্যে প্রথমজনের নাম প্রকাশ শুরু করেছে। ইসরাইলে রোববার বেইত শেমেশ শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নয়জন নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সীমিত সমর্থন পেয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা ও নিজেদের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ায় সীমাবদ্ধ রয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি হামলার প্রতি সমর্থন জানান, বুধবার সিডনিতে বলেন—এখন সময় ‘দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের।’