শিরোনাম

কক্সবাজার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : বঙ্গোপসাগরের প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে আজ থেকে আগামী ১ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ৯ মাস পর্যটকদের ভ্রমণ বন্ধ থাকবে।
সেন্ট মার্টিনে পর্যটকের ভ্রমণের সময়সীমা শেষ হয়েছে শনিবার (৩১ জানুয়ারি)। ২ মাসে দ্বীপে ভ্রমণ করেছে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার পর্যটক। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস পর্যটকদের ভ্রমণের অনুমতি থাকলেও রাতযাপনের অনুমতি না থাকায় নভেম্বর মাসে পর্যটকেরা দ্বীপে ভ্রমণ করেননি। মূলত ডিসেম্বর-জানুয়ারি এই দুই মাস দ্বীপে পর্যটকেরা ভ্রমণ করেছেন।
সেন্টমার্টিন রুটের পর্যটকবাহী জাহাজ মালিকদের সংগঠন ‘সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর আজ এ তথ্য জানান।
হোসাইনুল ইসলাম বাহাদুর বলেন, গত ১ নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস পর্যটকদের জন্য সেন্ট মার্টিন উন্মুক্ত করে দেয় সরকার। কিন্তু রাতযাপনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রথম মাসে (নভেম্বর) কোনো পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে যাননি। পরের দুই মাসে (ডিসেম্বর ও জানুয়ারি) অন্তত ১ লাখ ১৭ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেন, যা গত বছরের তুলনায় দেড় থেকে দু’হাজার বেশি।
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দারা জানান, সর্বশেষ গতকাল বিকেলে ছয়টি জাহাজ ও কয়েকটি কাঠের ট্রলারে অন্তত তিন হাজার পর্যটক, হোটেল-মোটেলের কর্মচারী ও ব্যবসায়ী দ্বীপ ছেড়েছেন। বিকেল চারটার পর দ্বীপের দুই শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ আর অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে পুরো দ্বীপ।
ঢাকার মগবাজারের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন (৪৫) বলেন, গত ডিসেম্বর মাসে তিনি টেকনাফ থেকে স্পিডবোটে সেন্ট মার্টিনে গিয়েছিলেন। একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। শনিবার থেকে রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকছে। তাই তিনিও ঢাকায় ফিরে যাচ্ছেন।
শনিবার সকালে দ্বীপের পশ্চিম সৈকতে নীল জলের স্বচ্ছ পানিতে গোসল করছিলেন কয়েকজন পর্যটক। তাঁদের একজন ঢাকার বারিধারার বাসিন্দা আলী আকবর (৪৫)। তিনি বলেন, এমভি কর্ণফুলী জাহাজে করে তাঁরা তিন বন্ধু ২৮ জানুয়ারি সেন্ট মার্টিনে গিয়েছিলেন। পায়ে হেঁটে পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখেন। শনিবার বেলা তিনটায় জাহাজে উঠে গন্তব্যে ফিরেছেন। তার আগে শেষবারের মতো নীল জলে গোসল সেরে নিয়েছেন।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দোকান মালিক সমিতির সহসভাপতি মৌলভি নুর আহমদ বলেন, টানা দুই মাস বিপুল পর্যটকে সেন্ট মার্টিন সরগরম ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যও কিছুটা চাঙা ছিল। শনিবার বেলা তিনটার পর থেকে পুরো সেন্ট মার্টিন পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। দুই শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট-রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলম বলেন, ৩১ জানুয়ারি সকাল সাতটার দিকে শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছড়া জেটিঘাট থেকে ছয়টি জাহাজ সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। জাহাজগুলোতে কোনো পর্যটক ছিল না। বেলা একটার দিকে জাহাজগুলো ১২০ কিলোমিটারের সাগরপথ পাড়ি দিয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জেটিঘাটে পৌঁছেছে। বিকেল তিনটা নাগাদ সেখানে অবস্থান করা অন্তত ২ হাজার ৫০০ পর্যটক নিয়ে জাহাজগুলো পুনরায় কক্সবাজার শহরে ফিরে এসেছেন। হোটেল মোটেলের আরও ৫০০ কর্মী কয়েকটি কাঠের ট্রলারে দ্বীপ ছেড়েছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত বছরের ২২ অক্টোবর ১২টি নির্দেশনাসংবলিত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে বলা হয়, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৯ মাস বন্ধ থাকার পর ১ নভেম্বর থেকে তিন মাসের জন্য সেন্ট মার্টিন উন্মুক্ত থাকবে। দৈনিক দুই হাজার পর্যটক দ্বীপ ভ্রমণে যেতে পারবেন। তবে নভেম্বর মাসে দ্বীপে রাত যাপন করতে পারবেন না। ডিসেম্বর-জানুয়ারি—এই দুই মাস রাতযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয় এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ যেকোনো জীববৈচিত্র্েযর ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানের চলাচল নিষিদ্ধ করা হয় । তা ছাড়া ভ্রমণকালে পলিথিন বহন ও ব্যবহারের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ওয়ানটাইম ব্যবহার্য প্লাস্টিক যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনি প্যাক, ৫০০ বা ১০০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিক বোতলের ব্যবহারও নিরুৎসাহিত করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, সরকারি নির্দেশনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটকের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ ক্ষত সারিয়ে উঠছে, ফিরছে জীববৈচিত্র্যও। এবার পর্যটকের জন্য প্রতিবেশ সংকটাপন্ন ছেঁড়াদিয়ায় ভ্রমণ নিষিদ্ধ ছিল। যেকারণে দ্বীপের বালুচরে আবারও শামুক-ঝিনুকের বিস্তার দেখা গেছে। সৈকতে বারবিকিউ ও আলোকসজ্জা না হওয়ায় নতুন সামুদ্রিক গুল্ম ও গাছপালা জন্মেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে দ্বীপটিকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, সেন্ট মার্টিন দ্বীপসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে পরিবেশ মন্ত্রণালয়।