বাসস
  ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৫১

পুরান ঢাকাকে ন্যায্য সম্মান ফিরিয়ে দেব: জামায়াত আমির

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ফাইল ছবি

ঢাকা, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, পুরান ঢাকাকে তার ন্যায্য সম্মান ফিরিয়ে দেব। ন্যায়ের ভিত্তিতে পুরান ঢাকার প্রতি যে সম্মান দেখানো দরকার, আমরা সেই সম্মান দেখাবো। কারণ, এটি তাদের অধিকার, এটি তাদের ন্যায্য হক।

তিনি বলেন, ইংরেজিতে একটা ছোট্ট কথা আছে— ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’। সেই অর্থেই আমরা পুরান ঢাকাকে সোনায় পরিণত করতে চাই। পুরান ঢাকার ঘরে ঘরে ভাত খেয়ে অনেকেই সংসদ সদস্য হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন, বড় আমলা হয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন, এমনকি কেউ কেউ সেনাপতিও হয়েছেন। কিন্তু, পুরান ঢাকার প্রতি যে কৃতজ্ঞতা আদায় করা উচিত ছিল, তা কেউ করেননি।

আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর ধুপখোলা মাঠে এক নির্বাচনী জনসভায় শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন। জনসভার আয়োজন করে জামায়াতের ঢাকা-৬ আসন নির্বাচনী কমিটি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইনশাআল্লাহ, আমরা পুরান ঢাকার প্রতি সেই কৃতজ্ঞতা আদায় করার সুযোগ নেব। আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আপনারা যে দাবিগুলো তুলেছেন, সেগুলো কোনো অযৌক্তিক বা বাড়াবাড়ি দাবি নয়। সবগুলোই একেবারেই ন্যায্য দাবি। পুরান ঢাকাকে তার ন্যায্য সম্মান ফিরিয়ে দেব।

তিনি আরও বলেন, রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব ছিল জাতিকে পথ দেখানো, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। তরুণ সমাজকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য গড়ে তোলা। শিশুদের মানসিক বিকাশের দায়িত্ব নেওয়া। যারা জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছেন-রাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব নেবে। প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

তিনি বলেন, এখানে কোনো জমিদার থাকবে না। সবাই মিলেমিশে জনগণ হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত ৫৪ বছরে পালাক্রমে যারা দেশ শাসন করেছেন, তারা এই দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার অধিকার নিশ্চিত করতে পারেননি। আমাদের সন্তানদের সোনার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেননি।

তিনি বলেন, এর ফল আজ আমরা দেখছি-সমাজে বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয়। তরুণ সমাজের একাংশ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, সামাজিক অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। কেন? কারণ, রাষ্ট্র তাদের গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা শিক্ষা পায়নি, অধিকার পায়নি। বঞ্চিত হয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা সমাজের বিপক্ষেই দাঁড়িয়ে গেছে।

এদের জন্য আমাদের বড় দরদ লাগে। এরা তো মানুষের সন্তান, এ দেশের নাগরিক। এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। রাষ্ট্র কীভাবে এত দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়? সরকার কীভাবে এতো দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়? কেন একটি মানব সন্তান জন্মের পর শৈশবে উপযুক্ত চিকিৎসা ও শিক্ষা পাবে না, প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তিনি বলেন, এই ব্যর্থতার দায় আমরা অস্বীকার করি না। আমরা দেশবাসীকে আশ্বাস দিচ্ছি— ইনশাআল্লাহ আমাদের ১১ দলীয় ঐক্যজোট যদি আপনাদের ভালোবাসা, সমর্থন ও ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পায়, তাহলে আমরা এই সামাজিক দায়িত্বগুলো পালন করবো।

শফিকুর রহমান বলেন, আমরা বাংলাদেশকে দল-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ফুলের বাগান হিসেবে সাজাতে চাই। মানুষে মানুষে কোনো বিভেদ থাকবে না। আমাদের পরিচয় হবে একটাই-আমরা বাংলাদেশি। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, তুমি কে? উত্তর হবে-আমি একজন বাংলাদেশি।

জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, এই বাংলাদেশ হবে ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ। এখানে সুশিক্ষার প্রসার হবে, সামাজিক নিরাপত্তা থাকবে, কর্মের অধিকার নিশ্চিত হবে। মানুষ ইজ্জতের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে দাঁড়াবে এবং বলবে-এটা আমার বাংলাদেশ।

‘১৯৪৭ সালে আমরা প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিলাম। কিন্তু যারা সেই অঙ্গীকার করেছিল, তারা দায়িত্ব পালন করেনি। তাই ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়েছিল। সেই যুদ্ধে মানুষ জীবন বাজি রেখেছিল সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আশায়। কিন্তু সেটাও পূর্ণ হয়নি।’

‘যারা রাজা হয়েছে, তারা কাঙালের ধন লুট করেছে। কেউ কেউ বলেছিল-বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল, বাংলাদেশ হবে সিঙ্গাপুর-কানাডা। কিন্তু, বাস্তবে কী হয়েছে? দেশের টাকা লুট করে কেউ সিঙ্গাপুরে ব্যবসা গড়েছে, কেউ কানাডায় ‘বেগমপাড়া’ বানিয়েছে।’

‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য নয়, সিঙ্গাপুর-কানাডা হয়েছে লুটেরাদের জন্য। আমরা দীর্ঘ ১৫ বছর রাজপথে লড়াই করেছি, নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আশা করেছিলাম-২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আমরা আত্মপর্যালোচনা করবো। কেউ জালিম হবে না। তাই আমি বলেছিলাম-এই দেশের মানুষ এক জালিমকে বিদায় করে আরেক জালিমের হাতে দেশ তুলে দিতে চায় না।’

‘আজ ব্যবসায়ীদের কান্না শুনি। চাঁদার নামে হুমকি, ভয়। আমরা স্পষ্ট করে বলছি-চাঁদা আমরা নেব না, চাঁদা নিতে দেব না। দুর্নীতি আমরা করবো না, সহ্যও করবো না। আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না-আমরা চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়।’

তিনি আরও বলেন, এই বিজয় আনতে সামনে দুটি ভোট। ১২ ফেব্রুয়ারি-গোলামি না আজাদি, এই প্রশ্নে গণভোট। আমরা বিশ্বাস করি-মানুষ আর একই গর্তে পা দেবে না। জুলাই কারো একার নয়। জুলাই ১৮ কোটি মানুষের। একক কোনো মাস্টারমাইন্ড ছিল না-এই যুদ্ধের মাস্টারমাইন্ড ছিল পুরো জাতি। জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই শেষ হয়নি। শেষ হবে না যতদিন না মুক্তির মঞ্জিলে পৌঁছাবো।

‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু কারো চোখ রাঙানি মেনে নেব না। কেউ আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করলে বিনয়ের সঙ্গে, কিন্তু শক্ত কণ্ঠে বলবো-দয়া করে দূরে থাকুন। যুবক-যুবতীদের আমরা বেকার ভাতা দেব না। আমরা কাজ দেব, সম্মান দেব। আমরা এই দেশ যুবসমাজের হাতে তুলে দিতে চাই।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১২ তারিখে কেউ যদি ভোটে হাত দেয়-তাদের রুখে দাঁড়াবেন। তোরটা তুই দে, আমারটা আমি দেব, এটাই আমাদের অবস্থান। পুরান ঢাকা অবহেলিত ছিল। আমরা বলি- ওল্ড ইজ গোল্ড। পুরান ঢাকাকে তার ন্যায্য সম্মান ফিরিয়ে দেব। শেষে মা-বোনদের উদ্দেশে বলি— আমাদের জীবনের চেয়েও মায়েদের ইজ্জতের মূল্য বেশি। আমরা গর্বের বাংলাদেশ গড়বো।