শিরোনাম

ঢাকা, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য, আয়, সম্পদ, ঋণ ও দায় বিবরণী কতটা সঠিক এবং আয় ও সম্পদ কতটা বৈধ উপায়ে অর্জিত তা যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
হলফনামায় প্রার্থীরা তাদের অর্জিত সম্পদ কতটা প্রকাশ করেছেন, সম্পূর্ণ প্রকাশ করেছেন কি না কিংবা দেশে বা বিদেশে সম্পদ আহরণের তথ্য গোপন করেছেন কি না— তা যাচাই যেমন অনিবার্য, তেমনি হলফনামা বিশ্লেষণে যে আয় ও সম্পদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা বৈধ আয়ের সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ— এ বিষয়গুলো যাচাই করে জবাবদিহি নিশ্চিতের উদ্যোগ নিতে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং রাজস্ব বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
আজ রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে এ আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের উপসমন্বয়ক জাফর সাদিক, সহসমন্বয়ক ও ড্যাশবোর্ড প্রস্তুতকারী রিফাত রহমান এবং কে. এম. রফিকুল আলম। প্রতিবেদন উপস্থাপনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং হলফনামার সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণও দাখিল করতে হয়। এবারের নির্বাচনে ২১জন প্রার্থী বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং তা ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন হলফনামায়।
আবার, একজন প্রার্থী বিদেশে তার নিজের কোনো সম্পদের তথ্য না দিলেও স্ত্রীর নামে দুবাইতে ফ্ল্যাটের মালিকানা রয়েছে। একজন প্রার্থী বিদেশে ৩টি ফ্ল্যাটের মালিকানা থাকার ঘোষণা দিলেও সংখ্যাটি কমপক্ষে তিনগুণ এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। আরেকজন প্রার্থী বিদেশে নিজস্ব মালিকানায় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকার কথা স্বীকার না করলেও অনুসন্ধানে মোট ১১টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রার্থীদের দাখিলকৃত হলফনামার তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের ব্যাপক তারতম্য দেখা গেছে। হলফনামার মাধ্যমে যে তথ্য প্রদান করা হয় তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন আছে। তথ্য গোপন করা হয়েছে কি না, প্রদর্শিত সম্পদ বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাকি দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত এবং দাখিলকৃত আয় বা সম্পদের বিপরীতে প্রদেয় করের পরিমাণ বাস্তবসম্মত কি না- এই তিনটি বিষয় অনুসন্ধান করা জরুরি।
টিআইবির হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। যাতে চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১৯৮১ জন, এবং তাদের প্রায় ১৩ শতাংশ স্বতন্ত্র। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থি দলগুলোর প্রার্থীদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামপন্থি দলগুলোর প্রার্থী মোট প্রার্থীর ৩৬ শতাংশের বেশি, বিগত ৫টি নির্বাচনের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। প্রতিবারের মতো এবারও নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণের হার নগণ্য এবং জুলাই সনদে প্রস্তাবিত ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা কোনো রাজনৈতিক দলই পূরণ করতে পারেনি।
প্রার্থীদের পেশা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থী মূল পেশা বিবেচনায় ব্যবসায়ী। আইন ব্যবসা ও শিক্ষকতা পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন যথাক্রমে ১২.৬১ এবং ১১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন ১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতে কোটিপতির সংখ্যা ৮৯১ জন। অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের মোট মূল্যের ভিত্তিতে ২৭ জন প্রার্থীর সম্পদ রয়েছে শত-কোটি টাকার ওপর। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশেরই কোনো না কোনো ঋণ বা দায় আছে।
প্রার্থীদের সর্বমোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকার বেশি। সর্বশেষ পাঁচ নির্বাচনের মধ্যে এবার ঋণ বা দায়গ্রস্ত প্রার্থী সবচেয়ে কম হলেও, মোট ঋণের পরিমাণে তা সবচেয়ে বেশি। এরমধ্যে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে বর্তমানে মামলা আছে ৫৩০ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে, যা মোট প্রার্থীর ২২.৬৬ শতাংশ। আর অতীতে মামলা ছিলো ৭৪০ জন বা ৩১.৬৪ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে। এবার সকল দলের প্রার্থীদের ঘোষিত সর্বমোট নির্বাচনী ব্যয় ৪৬৩.৭ কোটি টাকা, প্রার্থী প্রতি গড় ব্যয় সাড়ে ২২ লাখ টাকা। ঘোষিত সবচেয়ে বেশি ব্যয় বিএনপির- মোট ১১৯.৫ কোটি টাকা, দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মোট ব্যয় ৮০.৬ কোটি টাকা। হলফনামা বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, ২৫৯ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী-স্ত্রী/নির্ভরশীলদের অস্থাবর সম্পদ বেশি, ১১৮ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী-স্ত্রী/নির্ভরশীলদের দালান বা ফ্ল্যাট সংখ্যা বেশি এবং ১৬৪ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী-স্ত্রী/নির্ভরশীলদের জমির পরিমাণ বেশি।