শিরোনাম

ঢাকা, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা টেক ব্যাক বাংলাদেশের অর্ধেক পূরণ করেছি, স্বৈরাচার মুক্ত কিরেছি। এবার স্বৈরাচার মুক্ত দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হবে ধানের শীষকে বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে। তাই সকলের প্রতি আহ্বান জানাই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করুন।’
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে পূণ্যভূমি সিলেট নগরীর আলিয়া মাদরাসা মাঠে আয়োজিত বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের সমর্থনে ক্ষমতায় গেলে নবী করিম (সা.) এর মতো ন্যায় পরায়ণতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করবে বিএনপি।’
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আপনারা পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছেন—মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালট কীভাবে ডাকাতি করা হয়েছে। ঠিক যারা এই দেশ থেকে পালিয়েছে, তারা যেভাবে ভোট ডাকাতি করেছিল, ঠিক একইভাবে আবার সেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।’
ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিদেশে বসেও তারা ষড়যন্ত্র করছে। ইলিয়াস আলী, দিদার, জুনায়েদসহ হাজারো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে যে অধিকার আমরা অর্জন করেছি, সেই অধিকার রক্ষায় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বহু মানুষের জীবনের ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে আমরা খেয়াল করছি, দেশের ভেতরে ও বাইরে কিছু মহল ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করছে।’
সিলেটের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘চব্বিশের গণ-আন্দোলনে এই সিলেট শহরেই ১৩ জন জীবন দিয়েছেন। এই প্রাণগুলোর আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা যে অধিকার আদায়ের পথে নেমেছি, একটি কুচক্রী মহল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছে। দেশের ভেতরেও তাদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। কিন্তু ৫ আগস্ট বাংলাদেশের জনগণ প্রমাণ করেছে- সবাই ঐক্যবদ্ধ হলে যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব।’
নির্বাচনী প্রচারে ‘জান্নাতের টিকিট’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে শিরক বলে আখ্যায়িত করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘বেহেশত-দোজখের মালিক আল্লাহ। কোনো দল বা মানুষ এর টিকিট দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। যারা এমন কথা বলে, তারা মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে এবং মুসলমানদের দিয়ে শিরক করাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সিলেট থেকে অনেকেই হজ বা ওমরাহ করতে যান। সেখানে গিয়ে দেখেছেন কাবার মালিক আল্লাহ। এই পৃথিবী, আকাশ, সূর্য-নক্ষত্র—সবকিছুর মালিক আল্লাহ। অথচ একটি দল নির্বাচনের আগেই বলছে এই দেব, ওই দেব, এমনকি টিকিটও দিব। যার মালিকানা মানুষের নেই, সেটার প্রতিশ্রুতি দেওয়া মানে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা। নির্বাচনের আগেই তারা আপনাদের ঠকাচ্ছে, পরে কেমন ঠকাবে সেটা বুঝেই নিন।’
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, ‘ওই সময় অনেকের বিতর্কিত ভূমিকা জাতি দেখেছে। তাদের কারণেই লাখো ভাই শহীদ হয়েছেন এবং মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ তাদের চিনে রেখেছে। এখন এই মিথ্যাচার ও হঠকারিতার বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
মিথ্যা, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা স্বৈরাচার থেকে দেশকে মুক্ত করেছি। এখন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু ভোট ও কথা বলার অধিকার নয়, মানুষকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি মানুষ যেন ভালোভাবে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে, নিরাপদে চলাচল করতে পারে- সেটাই আমাদের লক্ষ্য।’
বিগত দিনে মানুষের রাজনৈতিক ও ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেখেছি গত ১৬ বছর ব্যালট ছিনতাই হয়েছে, ডামি ও নিশিরাতের নির্বাচন হয়েছে। বাক-স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গত ১৬ বছর অনেককে হারিয়েছি। গত ১৬ বছর এই দেশকে অন্য দেশের কাছে বন্ধক দেওয়া হয়েছিল। এ জন্য বলেছি, দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’
বিএনপি শুধু ভোট বা কথা বলার অধিকার নয়, দেশের মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চায় জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা শিক্ষিত সকল মা-বোনকে স্বনির্ভর করতে চাই। কৃষক কার্ড দিয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে চাই। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেশের প্রত্যেকটি পরিবারের নারী পুরুষকে সাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। বেকার যারা আছেন, তাদেরকে আর বেকার থাকতে দেব না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদেরও কাজে লাগাব।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি শহীদ জিয়ার সময়, খালেদা জিয়ার সময় দেশ এগিয়েছে। কলকারখানা হয়েছে, কর্মসংস্থান হয়েছে, মানুষ বিদেশে কাজের সুযোগ পেয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা বলি- করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’
সিলেটের প্রবাসীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘সিলেটের অধিকাংশ মানুষ লন্ডন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। আমরা চাই এই মানুষগুলোকে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে। সরকার থেকেও আমরা ইনশাআল্লাহ সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করব, যাতে সেই দক্ষ মানুষটিকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে পারি।’
এর আগে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সমাবেশ শুরু হয়৷ দুপুর ১২টা ২৮ মিনিটে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভা মঞ্চে পৌঁছান তারেক রহমান। এ সময় তিনি হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।
তারেক রহমান সভামঞ্চে আসার পর দলের নেতা-কর্মীরা ‘তারেক রহমানের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’, ‘সিলেটবাসীর পক্ষ থেকে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা’, ‘ভোট দেব কীসে, ধানের শীষে’, ‘লাগারে লাগা, ধান লাগা’ প্রভৃতি স্লোগান দিতে থাকেন।
সিলেট জেলা ও মহানগর এবং সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির উদ্যোগে এ জনসভা আয়োজন করা হয়। সকালে জনসভা শুরু হওয়ার পর স্থানীয় নেতারা মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।
জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫ বছর গণতন্ত্রের জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছে, গুম হয়েছে, কিন্তু মাথা নত করেনি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে আজকে নতুন বাংলাদেশের পথে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘একটি দল বিএনপির বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছে। এরা মানুষের ভোট পাবে না। এরা স্বাধীনতা বিরোধী। এদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
জনসভা সঞ্চালনা করেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী।
বুধবার রাত থেকেই বিভিন্ন উপজেলা ও জেলার নেতাকর্মীরা আলিয়া মাদরাসা মাঠে আসতে থাকেন। কেউ ব্যানার হাতে, কেউ দলীয় পতাকা নিয়ে মাঠের আশপাশে অবস্থান নেন। বৃহস্পতিবার সকাল হতেই মাঠ ও সংলগ্ন সড়কগুলোতে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলিয়া মাদরাসা মাঠ এরই মধ্যে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। বিএনপির নেতা-কর্মীরা ধানের শীষ আঁকা এক রঙের গেঞ্জি, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবিসংবলিত টি-শার্ট, দলের ব্যানার, ফেস্টুন এবং সিলেটের বিভিন্ন জেলার দলীয় নেতাদের ছবি নিয়েও সমাবেশস্থলে উপস্থিত হয়েছেন। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে জনসভাস্থল।
তারেক রহমান সিলেট ছাড়াও আজ আরও ছয়টি জেলার ছয়টি স্থানে নির্বাচনী জনসভায় যোগ দেবেন। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে প্রধান অতিথির ভাষণ শেষে তিনি সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন।
পথিমধ্যে তিনি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কসংলগ্ন ছয় জেলায় আয়োজিত সভায় ভাষণ দেবেন। এর মধ্যে প্রথমে মৌলভীবাজারের সদর উপজেলার শেরপুরের আইনপুর খেলার মাঠে এবং পরে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা পরিষদের মাঠে আয়োজিত সভায় যোগ দেবেন।
পরে তারেক রহমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া ফুটবল খেলার মাঠে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব স্টেডিয়ামে, নরসিংদীর পৌর পার্কে এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার অথবা রূপগঞ্জ গাউসিয়া এলাকায় আয়োজিত সমাবেশে যোগ দেবেন।
এসব জনসভায় তিনি সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর বিএনপি-মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন।