বাসস
  ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:২৯
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৩২

সুনামগঞ্জে ছাতক সিমেন্ট কারখানার সংস্কার কাজ শিগগিরই শুরু হবে

ছবি: বাসস

মুহাম্মদ আমিনুল হক

সুনামগঞ্জ, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস): জেলার ছাতক উপজেলার একমাত্র সরকারি সিমেন্ট কারখানার সংস্কার শুরু হচ্ছে শিগগিরই। সুনামগঞ্জ জেলার শিল্পাঞ্চলখ্যাত ছাতক উপজেলা। এ উপজেলায় পাথর, বালু ও সাদা-চুনাপাথর থেকে শুরু করে সিমেন্ট কারখানা ও পেপার মিল রয়েছে।

মেঘালয় পাহাড়ের সীমান্তবর্তী সুনামগঞ্জ জেলার বৃহত্তম উপজেলা ছাতকের সুরমা নদীর তীরে ব্যক্তি মালিকানায় সিমেন্ট শিল্প স্থাপনে উদ্বুদ্ধ হয়ে কয়েকজন শিল্পোদ্যোক্তা ১৯৩৭ সালে একটি সিমেন্ট কারখানার নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশের এ এলাকায় প্রতিষ্ঠার সময় নাম ছিল ‘আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট কোম্পানি’। ১৯৪১ সালের জুলাই মাসে কারখানায় পরীক্ষামূলকভাবে সিমেন্ট উৎপাদন শুরু হয় এবং ওই বছরের ১৮ নভেম্বর আসাম প্রদেশের গভর্নর স্যার রবার্ট নীল রীড এ কারখানার উদ্বোধন করেন।

এরপরই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সিমেন্ট উৎপাদন শুরু হয়। তখন এর বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ছিল মাত্র ৬০,০০০ মে. টন। ১৯৪৬ সালে কারখানার সাথে চুনাপাথর আহরণের খনি কেএলএমসি (কোমরা লাইমস্টোন মাইনিং কোম্পানি) রোপওয়ে চালুর মাধ্যমে সংযুক্ত হয়। ছাতক সিমেন্ট কো. লি. হতে কোমরা লাইমস্টোন মাইনিং কো. লি. এর দূরত্ব প্রায় ১৭ কি.মি.। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পরও কারখানাটি পূর্বের মালিকানাধীন রয়ে যায় এবং তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সিমেন্টের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৫৯ সালে বার্ষিক ৯০,০০০ মে. টন ক্ষমতা সম্পন্ন দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন করা হয়। 

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধচলাকালীন সময় মালিক কারখানাটি ছেড়ে যান। যুদ্ধের পর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কারখানার মালিকানা গ্রহণ করে এবং ইপিআইডিসি’র কাছে ব্যবস্থাপনা অর্পণ করে। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিএমওজিসি, পরে বিএমইডিসি এবং সর্বশেষ ১৯৮২ সালের পহেলা জুলাই ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। তারপর ছাতক সিমেন্ট কারখানাটি কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়ে নামকরণ হয় ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিএল)।

ব্রিটিশ আমল থেকে ছাতক সিমেন্ট কারখানা চুনাপাথর সরবরাহ করে আসছে। পরবর্তীতে কেএলএমসি’র ওপর ২০২০ সালে ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও ভারত সরকার সে দেশে কেএলএমসি নিবন্ধন নবায়ন না করায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে চুনাপাথর আমদানিও বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রতিষ্ঠান থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত পাথর আমদানির চুক্তি ছিল ছাতক সিমেন্ট কারখানার। বর্তমানে কেএলএমসি’র মাইনিং কার্যক্রম আবারও চালু হয়েছে। তবে ভারতীয় অংশে রোপওয়ে নির্মাণ কাজে চীনা সংস্থাকে ভারত সরকার অনুমতি না দেয়ায় কাজ হয়নি গত কয়েক বছর। তবে ভারতীয় অংশের রোপওয়ে নির্মাণ কাজ কেএলএমসি’র মাধ্যমে সম্পাদন করা হবে।

ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুর রহমান বাসসকে জানান, ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি কর্তৃক রক্ষণাবেক্ষণ করা রোপওয়ে সর্বশেষ ১৯৯৫ সালে আধুনিকীকরণ করা হয়। রোপওয়েতে প্রায় ২০০টি বালতি রয়েছে, প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৭০০ কেজি। যদিও আধুনিক মেশিনের চাহিদা ছিল, কিন্তু তহবিলের স্বল্পতার কারণে করা যায়নি।

২০২৫ সালের ১৪ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ছাতক সিমেন্ট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুর রহমান স্বাক্ষরিত ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় (২য় সংশোধিত) উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ২৩০ জনকে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। 

ওয়াটার ট্রিটমেন্ট ও বয়লারসহ এসটিজি পাওয়ার প্লান্টের মোডিফিকেশন ও রিনোভেশন কাজ গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ করার কথা ছিল। সিলেট থেকে সিএমএস, আরএমএস এবং ২টি নদী ক্রসিংসহ ৪৮ কি.মি. ডেডিকেটেড গ্যাস লাইনের কাজ আগামী মে মাসে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। এছাড়াও রোপওয়ের পাইলিং এবং ভিত্তি নির্মাণের শতভাগ কাজ আগামী এপ্রিল মাসে শেষ হবে উল্লেখ করা হলেও রোপওয়ে নির্মাণ ও ইনস্টলেশন কাজ আগামী মে মাস পর্যন্ত হবে ৩০%। আগামী এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর (বিদেশি প্রশিক্ষণ) নেবেন ৬৯ জন।

এদিকে ২০১০-১১ সালের দিকে কারখানার প্রতিটি ইউনিট অতি জরাজীর্ণ ও পুরাতন যন্ত্রপাতি মেরামত অযোগ্য হয়ে পড়ায় উৎপাদন ক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছাতে থাকে। কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন ৩৫,০০০ মে. টনে এসে দাঁড়ায়। ২০১২ সালে সরকার কারখানাটি টিকিয়ে রাখার নির্দেশনা দেয়ার ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ‘ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদন পদ্ধতি ওয়েট প্রসেস থেকে ড্রাই প্রসেসে রূপান্তরকরণ’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।

দৈনিক ১৫০০ মে. টন ক্লিংকার ও ৫০০ মে. টন সিমেন্ট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন কারখানা স্থাপনের লক্ষ্যে জিওবি অর্থায়নে ৬৬৬ দশমিক ৮১ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জানুয়ারি ২০১৬ থেকে ডিসেম্বর ২০১৯ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ‘কনভারশন অব ওয়েট প্রসেস টু ডাই প্রসেস অব সিসিসিএল’ প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ৮ মার্চ একনেকে অনুমোদিত হয়। পরে সংশোধনী এনে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৮৯০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন মেয়াদ ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন এবং প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৪১৮ কোটি টাকায়। এরপর প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। তবে এই সময়সীমার মধ্যেও কাজ শেষ করা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বয়ং প্রকল্প পরিচালক।

প্রকল্পের প্যাকেজে বর্ণিত কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে চীনা কোম্পানি মেসার্স নানাঝিং সি-হোপ সিমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কো. লি. চায়না এর সাথে ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই তারিখে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। প্যাকেজের চুক্তি মূল্য ৭ কোটি ৯৭ লাখ ৭৫ হাজার ৮০০ ডলার। প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির প্রায় ৯২ শতাংশ সার্বিক বাস্তবায়ন হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ অংশের রোপওয়ের ১১ দশমিক ৭৪১ কি.মি. এর মধ্যে ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হলেও ভারতীয় অংশের ৪ দশমিক ৫৮৮ কি.মি. কাজ এখনো শুরু হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী ১৬ দশমিক ৩২৯ কি.মি রোপওয়ে এর মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১১ দশমিক ৭৪১ কি. মি. এর নির্মাণ কাজ চলমান থাকলেও ভারতীয় অংশের রোপওয়ে নির্মাণ কাজ গত ৪ থেকে ৫ বছর ধরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট ছাতক সিমেন্ট কারখানার ভারতীয় অংশের রোপওয়ে নির্মাণ কাজ আন্তর্জাতিক সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সম্পাদনের অনুমোদন দেয় সরকার। চীনের ঠিকাদার মেসার্স নানাঝিং সি-হোপ সিমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডও কোমোরা লাইমস্টোন মাইনিং কোম্পানি (কেএলএমসি) এর মাধ্যমে ভারতীয় অংশের রোপওয়ে নির্মাণ কাজ বাস্তবায়নে সম্মত হয়েছে। 

ভারতীয় অংশের রোপওয়ে স্থাপন কাজের মূল্য ১৭ কোটি ভারতীয় রুপি সমতুল্য ২০ লাখ ১৩ হাজার ৩৫৫ মার্কিন ডলার। সাধারণ ঠিকাদারের মোট চুক্তি মূল্য ৭ কোটি ৯৭ লাখ ৭৫ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার থেকে ভারতীয় অংশের কাজের মূল্য বাবদ ২০ লাখ ১৩ হাজার ৩৫৫ মার্কিন ডলার কর্তন করে কেএলএমসি’র কাজের বিল পরিশোধ করা হবে। 

ছাতক সিমেন্ট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুর রহমান বাসসকে বলেন, ড্রাই প্রসেসে রূপান্তরের ৯২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। রোপওয়ের বাংলাদেশ অংশের কাজ চলছে। তবে ভারতের একটি কোম্পানি শিগগিরই কাজ শুরু করবে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত থাকলেও আরও বেশি সময় লাগতে পারে। এসময় কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে ও উৎপাদনে যাবে ছাতক সিমেন্ট কারখানা তা তিনি সঠিকভাবে বলতে পারেননি। 

গ্যাস সংযোগের কাজও শুরু হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ছাতক সিমেন্ট কারখানা উৎপাদনে গেলে প্রতিদিন ১৫০০ টন ক্লিংকার ও ৫০০ টন সিমেন্ট উৎপাদন করা যাবে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মত কাজ সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।

৯২ শতাংশ কাজ শেষ হলেও রোপওয়ে (রজ্জুপথ/তারের মাধ্যমে পাথর আনার পথ), গ্যাস সংযোগসহ বিভিন্ন কাজ না হওয়ায় প্রায় চার বছর ৮ মাস ধরে ৮৯ বছরের ঐতিহ্যবাহী দেশের প্রথম সিমেন্ট কারখানা ‘ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিসিএল)’ এর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির কোন কাজ হচ্ছে না তিন বছর ধরে। 

এদিকে তিন বছরের প্রকল্পটি ১০ বছরে গড়ালেও কবে কাজ শেষ হবে, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। ৬৬৭ কোটি টাকা প্রকল্প খরচ বেড়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা হয়েছে। অন্যদিকে চুনাপাথর না পেয়ে ২০২১ সালের মে মাস থেকে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। 

শিল্প মন্ত্রণালয় ও ছাতক সিমেন্ট কারখানা সূত্রে জানা যায়, ড্রাই প্রসেসে রূপান্তরের ৮ শতাংশ কাজ বাকী রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন বাজারমূল্যে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার ক্লিংকার ও সিমেন্ট উৎপাদন হবে।

উপদেষ্টা আদিলুর রহমান বাসসকে বলেন, ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির বিদ্যমান ওয়েট প্রসেস পদ্ধতি থেকে ড্রাই প্রসেসে রূপান্তরের মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে আরও লাভজনক ও টেকসই করা হবে। সিমেন্টের জন্য ক্লিংকার সীমান্তের ওপার থেকে আমদানি করতে হয়। আশা করি এই সরকারের সময়েই এ উন্নয়ন কাজ শুরু হবে।