বাসস
  ১০ জুন ২০২৬, ১৭:৪৭

দিনাজপুরে মৎস্য সম্প্রসারণ খামারটির মৎস্য পোনা উৎপাদনে সফলতা অর্জন

ছবি: বাসস

রোস্তম আলী মন্ডল

দিনাজপুর, ১০ জুন, ২০২৬ (বাসস) : দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলায় উত্তর-পশ্চিম মৎস্য সম্প্রসারণ ও বীজ উৎপাদন খামারটি মৎস্য পোনা উৎপাদনে সফলতায় ফিরেছে। আজ বুধবার জেলার পার্বতীপুর উপজেলায় অবস্থিত মৎস্য পোনা উৎপাদন খামারের ব্যবস্থাপক মো. মাহফুজুল হক এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকারের মৎস্য অধিদপ্তরের সফল উদ্যোগে এ খামারটিতে মাছের বীজ উৎপাদন কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে। এক সময় জনবল স্বল্পতার কারণে মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল এই মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারটি। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উদ্যোগের কারণে এ খামারে দেশের সাদা সোনাখ্যাত গলদা চিংড়ি উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে স্থানীয় প্রায় দেড় হাজার মৎস্য চাষি মাছ চাষে সফলতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।

তিনি আরও বলেন, ১৯৬৪ সালে ৫০ একর জমি উপর মাছের মৌসুমে বীজ উৎপাদন খামারটি স্থাপিত করা হয়েছিল। দীর্ঘ-দিনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনায় খামারটি মৎস্য বীজ উৎপাদনে তেমন একটা সফলতা সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। বর্তমান সরকারের মৎস্য অধিদপ্তরের দিক-নির্দেশনায় এবং জেলা মৎস্য কার্যালয়ের পরিকল্পনায় খামারটি এখন দেশের আদর্শ মৎস্য-বীজ উৎপাদন কার্যক্রম দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।

খামার কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা যায়, এ খামারে রয়েছে মাছের পোনা উৎপাদনের জন্য ৪৬টি পুকুর। মৎস্য বীজ উৎপাদনের জন্য আধুনিক মানের প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স। এখানে কার্প-জাতীয় রুই, কাতলা, সিলভার, বিগ হেড, গ্রাস-কার্প, কালিবাউস, বাটা ও দেশীয় প্রজাতির শিং, মাগুর, কই, গুলসা, টেংরা ও পাবদার পোনা সফল-ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।

আরও জানা যায়, গত ২০০২ সালের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন মৎস্য ও পশু-সম্পদ মন্ত্রী এই প্রকল্প কমপ্লেক্সের গলদা চিংড়ি হ্যাচারির উদ্বোধন করেছিলেন। এর পর চলতি বছর এবারই প্রথম পার্বতীপুর উত্তর-পশ্চিম মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার থেকে জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রায় ৫ মেট্রিক টন পোনা সরবরাহ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই খামারটি থেকে উৎপাদিত মৎস্য বীজে গলদা চিংড়ি বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

জেলার পার্বতীপুর উপজেলার হাবড়া গ্রামের মাছ চাষি মো. আরশেদ আলী জানান, ‘মাছ চাষ করে আমি জীবিকা নির্বাহ করি। বর্তমান মাছের বাজার দর ভালো আছে। আগে মাছের পোনা আমাদের এই অঞ্চলে তেমন পাওয়া যেত না। বাইরের জেলা থেকে বিভিন্ন মাছের পোনা সংগ্রহ করে ৩ টি পুকুরে চাষ করতাম। বাইরে থেকে পোনা আনায় খরচ বেশি হতো। বর্তমানে পার্বতীপুর মৎস্য সম্প্রসারণ ও বীজ উৎপাদন খামারের সহযোগিতায় এখন আমরা সব ধরনের মাছের পোনা সহজে পাচ্ছি।’

ফুলবাড়ী উপজেলার সুজাপুর গ্রামের মাছ চাষি মো. আমজাদ আলী জানান, পার্বতীপুর মৎস্য সম্প্রসারণ ও বীজ উৎপাদন খামার থেকে মাছের পোনা সংগ্রহ করে এবার ২টি পুকুরে মিশ্র জাতের মাছ চাষ করেছি। এই খামারের উৎপাদিত পোনার মান খুব ভালো। খামার কর্তৃপক্ষ মাছ চাষিদের সঠিকভাবে পরামর্শ দিয়ে সব সময় সহযোগিতা করেন। তবে বর্তমানে বাজারে মাছের খাদ্যের দাম অনেক বেশি। খাদ্যের দাম একটু কমালে আমরা মাছ চাষে আরও লাভবান হতে পারতাম।

খামার সূত্রে জানা গেছে, এক সময় ধারণা করা হচ্ছিল, এই অঞ্চলের মাটি ও পানি চিংড়ি চাষের উপযুক্ত নয়। কিন্তু খামারে সফল গলদা চিংড়ি বীজ উৎপাদন এই অঞ্চলে চিংড়ি চাষে আগ্রহের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালের কর্ম-পরিকল্পনায় এই খামারে সাড়ে ৪ লাখ পিস গলদা চিংড়ির পোনা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। 

এ তথ্য নিশ্চিত করেন, খামারের ব্যবস্থাপক মো.মাহফুল হক।

তিনি বলেন, খামারটি দেশের মধ্যে আদর্শ খামারে পরিণত করার লক্ষ্যে মাছের পোনা উৎপাদনে পরিকল্পনা অনুযায়ী আধুনিক প্রদ্ধতিতে মৎস্য পোনা উৎপাদনে কাজ করে যাচ্ছি। এই খামারে শুধু গলদা চিংড়ি নয়, যেনো সাদা সোনা উৎপাদিত হচ্ছে বলে তিনি ব্যক্ত করেন।

খামার ব্যবস্থাপক বাসস’কে বলেন, গলদা চিংড়ির পিএল (পোস্ট লার্ভা) উৎপাদনের ক্ষেত্রে জীবন-চক্রের শুরুতে নোনা পানির দরকার হয়। এ ক্ষেত্রে কক্সবাজারের পেকুয়া থেকে নোনা পানি সংগ্রহ করে স্বাদু পানি বা মিঠা পানির সঙ্গে খাপ খাইয়ে, পিএল উৎপাদন করা হয়। 

তিনি বলেন, উৎপাদনের ক্ষেত্রে বরগুনা জেলার আমতলীর পায়রা নদী থেকে গলদা চিংড়ির মা মাছ সংগ্রহ করে আনা হয়। মা মাছ থেকে লার্ভা সংগ্রহ করে ২৮ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে পিএল উৎপাদন করা হচ্ছে।

দিনাজপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তারিফুর রহমান সরকার বাসস’কে বলেন, এ অঞ্চলে দেশীয় মাছ গুলো প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এমন মুহূর্তে এ খামারে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদন শুরু করা হয়েছে। এসব পোনা মাছ চাষি পর্যায়ে চাষ করার লক্ষ্যে চাষিদের জন্য বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। এছাড়া খামারে গলদা চিংড়ির পিএল উৎপাদন করা হয়। লোকবল স্বল্পতা নিয়ে খামারে সব কাজ সফল ভাবে করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

রংপুর বিভাগীয় মৎস্য অধিদফতরের উপ পরিচালক সুজিত কুমার চাটার্জ্জী বাসস’কে বলেন, পার্বতীপুর উত্তর-পশ্চিম মৎস্য সম্প্রসারণ ও বীজ উৎপাদন খামারে উৎপাদিত পোনা মাছ চাষে অগ্রগতি হয়েছে। অব্যস্থাপনায় এক সময় খামারটি অচল অবস্থার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের মৎস্য অধিদপ্তরের যুগ-উপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণে এখন সে অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, এই খামারে গলদা চিংড়ির উৎপাদনে আমরা ব্যাপক সফলতা পেয়েছি। বর্তমানে এ খামার থেকে প্রায় দেড় হাজার মাছ-চাষি পোনা নিয়ে মাছ চাষ করছেন। আবার চাষি পর্যায়ে গলদা চিংড়ি ও দেশি প্রজাতির মাছ চাষ করতে বিভিন্ন কর্মশালার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এভাবে দেশি মাছের সংকট দূর করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।