বাসস
  ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৮

পটুয়াখালীতে আম উৎপাদন ছাড়িয়ে যাবে লক্ষ্যমাত্রা 

জেলা জুড়ে আমগাছে এসেছে মুকুল । ছবি: বাসস

\ এনামুল হক এনা \

পটুয়াখালী, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বাসস): দক্ষিণের উপকূলীয় জনপদ পটুয়াখালী জেলা জুড়ে এখন বইছে আমের মুকুলের মাতাল করা ঘ্রাণ। শীতের শেষে বসন্তের আগমনে জেলার গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি আমগাছেই এসেছে মুকুল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং কৃষকদের বাড়তি পরিচর্যায় চলতি মৌসুমে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্টরা।

পটুয়াখালী জেলা সদর, বাউফল, দশমিনা, গলাচিপা, কলাপাড়া, দুমকি ও মির্জাগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা আম বাগানগুলোতে এখন মুকুলে ভরে গেছে গাছের ডালপালা। ভোরের হালকা হালকা কুয়াশা আর সকালের রোদে মুকুলের মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। এতে কৃষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে নতুন স্বপ্ন ও আশাবাদ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জেলায় ৬৮০ হেক্টর জমিতে আম চাষ করে ১৭ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়েছিল। গড় ফলন ছিল প্রতি হেক্টরে ২৫ মেট্রিক টন। এ বছর আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০৫ হেক্টর জমিতে এবং সম্ভাব্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এ বছর শীতের তীব্রতা কম এবং আবহাওয়া তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় মুকুল আসার হার ভালো হয়েছে। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরামর্শে কৃষকরা নিয়মিত পরিচর্যা, সুষম সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই দমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করায় ফলন গত বছরের তুলনায় এ বছর আরও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জেলার বাউফল উপজেলার মদনপুরা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল করিম বলেন, গত কয়েক বছর ধরে আম চাষ করে ভালো লাভ পাচ্ছি। এ বছর গাছে অনেক বেশি মুকুল এসেছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে ফলন বেশি হবে বলে আশা করছি।

একই উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়নের আরেক কৃষক নূরুল ইসলাম জানান, “আগে শুধু ধান চাষ করতাম। এখন আম চাষেও ভালো আয় হচ্ছে। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত পরামর্শ পাওয়ায় গাছগুলো ভালো আছে।”

কৃষি বিভাগ জানায়, পটুয়াখালী জেলায় এ বছর আম্রপালি, হিমসাগর, ল্যাংড়া, গোপালভোগসহ বিভিন্ন জাতের আম চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে আম্রপালি জাতের আমের চাহিদা ও ফলন বেশি হওয়ায় কৃষকরা এ জাতের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া আম চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় এ অঞ্চলে আম উৎপাদনের সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে। এছাড়া বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় জেলার কৃষকরা ধানসহ অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি আম চাষে ঝুঁকছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা আরও জানান, আম চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর আওতায় উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, আম চাষের বিস্তারে শুধু কৃষকদের আয়ই বাড়ছে না, বরং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে। বাগান পরিচর্যা, আম সংগ্রহ এবং বাজারজাতকরণে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

সব মিলিয়ে আমের মুকুলে ভরে ওঠা পটুয়াখালীর গ্রামাঞ্চল এখন সম্ভাবনার নতুন বার্তা দিচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে জেলার আম উৎপাদন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাউফলের দক্ষিণ বিলবিলাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা আহসান বাসসকে বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ের চারপাশে অনেক আমগাছ রয়েছে। এ বছর প্রতিটি গাছেই প্রচুর মুকুল এসেছে। সকালে বিদ্যালয়ে আসার সময় চারপাশে মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণে মন ভরে যায়। এটি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং কৃষকদের জন্যও সুখবর বয়ে এনেছে। আশা করছি, এ বছর আমের ভালো ফলন হবে এবং কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে আরও লাভবান হবেন।”

এ বিষয়ে পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বাসসকে বলেন, “গত বছর জেলায় ৬৮০ হেক্টর জমিতে ১৭ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়েছিল। এ বছর ৭০৫ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমরা আশা করছি, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।”

তিনি আরও বলেন, “আম চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ফলে নতুন নতুন বাগান তৈরি হচ্ছে এবং পুরনো বাগানগুলোতেও ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে।”