শিরোনাম

চট্টগ্রাম, ২২ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): সকল সরকারি ‘প্রশিক্ষণ কর্মশালার’ চেনা দৃশ্য সাধারণত একইরকম।
মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ দেন, অংশগ্রহণকারীরা শোনেন আর শেষ পর্বে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে এসে বক্তব্য দিয়ে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেন। কিন্তু এবার সেই চিরচেনা দৃশ্যের ব্যতিক্রম দেখা গেল।
ঘটনা গত ১৯ আগস্ট, বুধবারের। চট্টগ্রামে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের প্রেস ব্রিফিংয়ের জন্য সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কর্মসূচি অনুযায়ী বিকেল ৪টায় প্রতিমন্ত্রীর ব্রিফ করার কথা।
সাংবাদিকদের অনেকে কিছুটা আগেভাগেই অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন। কিন্তু পিটিআই অডিটোরিয়ামে গিয়ে তাদের চোখ ছানাবড়া! তারা দেখেন এক নয়া দৃশ্য—প্রতিমন্ত্রী নিজেই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় সেশন পরিচালনা করছেন।
গণমাধ্যমকর্মীরা জানান, মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ স্পিকার হাতে নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চট্টগ্রাম বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কথা শুনছেন, তাদের অভিজ্ঞতা জানতে চাইছেন এবং সরকারি নীতিমালা কীভাবে আরও কার্যকর করা যায় সে বিষয়ে তাদের মতামত নিচ্ছেন।
এ সময় সাংবাদিকরা জানতে চান, ‘প্রতিমন্ত্রী সংবাদ ব্রিফিং কখন করবেন?’ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যার, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে প্রশিক্ষণ সেশন পরিচালনা করছেন, বিকেল সাড়ে ৪টায় শেষ করবেন বলেছেন।
এরপর ব্রিফিং করবেন।’
অর্থাৎ টানা ছয় ঘণ্টা তিনি ওই কর্মশালায় প্রশিক্ষণ দেন। অডিটোরিয়ামে ব্রিফিংয়ের জন্য অপেক্ষায় থাকা চট্টগ্রামের সিনিয়র একজন সাংবাদিক বলে ওঠেন—‘এমন ঘটনা আগে দেখিনি! এখানে প্রতিমন্ত্রী নিজেই তো প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে, এটাই তো নতুন বন্দোবস্ত।’
কর্মশালায় অংশ নেওয়া প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মশালায় প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতি প্রচলিত অর্থে কোনো আনুষ্ঠানিক অতিথির উপস্থিতি নয়। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। একটি নির্দিষ্ট বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ না করে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে মতবিনিময়, প্রশ্নোত্তর এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে শিক্ষকদের কাজের বাস্তব পরিবেশ, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, নীতিমালার প্রয়োগে জটিলতা এবং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে কী ধরনের পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের পিটিআই (প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট) অডিটোরিয়ামে ‘বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা, মনিটরিং, জবাবদিহিতা ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি পরিবর্তিত প্রত্যাশা’ শীর্ষক দিনব্যাপী ওই প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
এতে চট্টগ্রাম বিভাগের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং পিটিআই ইনস্ট্রাক্টরসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।
কর্মশালায় অংশ নেওয়া কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা পিইটিসি’র (প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টার) ইনস্ট্রাক্টর মো. মমিনুল ইসলাম মজুমদার বাসসকে বলেন, ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী নিজেই দীর্ঘসময় প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা করছেন এমনটি আগে কখনো দেখিনি। উনি খুবই যোগ্য এবং দক্ষ এবং মানুষ, খুব সুন্দর করে সবকিছু বুঝিয়ে বলছেন। উপস্থিত সবাই খুব খুশি হয়েছেন, কারণ আমরা প্রয়োজনীয় কথাটি সরাসরি প্রতিমন্ত্রীকে বলতে পেরেছি। অংশগ্রহণকারীরা প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও পরে বিষয়টি খুব স্বাভাবিক ও কার্যকর মনে হয়েছে। কারণ তিনি শুধু নিজের বক্তব্য তুলে ধরেননি বরং কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।’
বান্দরবান জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ত্রিরতন চাকমা বলেন, ‘আমাদের মাঠপর্যায়ে যে বাস্তবতা, সেটি নীতিনির্ধারণের টেবিলে সবসময় পুরোপুরি পৌঁছায় না। প্রতিমন্ত্রী সরাসরি আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন কোথায় সমস্যা, কীভাবে কাজ আরও সহজ করা যায়। একজন নীতিনির্ধারক যখন বাস্তবায়নকারীদের কাছ থেকে এভাবে শুনতে চান, তখন সেটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।’
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘ছয় ঘণ্টা ধরে একজন প্রতিমন্ত্রীর শেখানোর চেয়ে শেখার আগ্রহটাই বেশি চোখে পড়েছে। তিনি শুধু আমাদের বোঝাতে আসেননি, আমাদের কাছ থেকেও জানতে চেয়েছেন। কোথায় শিক্ষকরা সমস্যায় পড়ছেন, কর্মকর্তাদের কী ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে, নীতিমালার কোন জায়গাগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়—এসব নিয়ে তিনি প্রশ্ন করেছেন।’
খাগড়াছড়ি জেলার উপ-সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসানুল কবির বলেন, ‘এবারের কর্মশালায় পুরোপুরি ভিন্ন একটি অভিজ্ঞতা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী মঞ্চে বসে থাকার পরিবর্তে কর্মশালার ভেতরে ছিলেন। তিনি সরাসরি আমাদের কথা শুনেছেন। কর্মকর্তারা খোলামেলা কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। অতীতে এমনটা আর হয়নি।’
এই কর্মকর্তার মতে, এই ধরনের আয়োজন নিয়মিত করা হলে সরকারের নীতিমালা আরও বাস্তবমুখী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
কর্মশালা এবং প্রেস ব্রিফিং শেষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন বাসসের প্রতিবেদক। ‘প্রতিমন্ত্রী নিজেই প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা করছেন—দেশে ঘটনা আগে দেখা যায়নি, এ ব্যাপারে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা হচ্ছে দেশের কোনো শিশু যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং প্রশাসনের সর্বত্র যেন সুশাসন নিশ্চিত হয়। সে জন্য নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে, দেশের প্রাথমিক শিক্ষা যারা মনিটরিং করেন তাদের মূল সমস্যা জানতে হবে, এখানে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তাই সরাসরি সেশন পরিচালনা করছি।’
ববি হাজ্জাজ আরও বলেন, ‘শুধু আমি একা নই, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা সবাই যার যার ক্ষেত্রে নিজের সর্বোচ্চ মেধা কাজে লাগিয়ে, দিনরাত পরিশ্রম করে এই দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করছেন।’
প্রশিক্ষণ সেশনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের প্রতিটি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শতভাগ কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে—এটা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কোনো বিদ্যালয় কেন অকার্যকর, শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা, প্রশিক্ষণের ঘাটতি কিংবা অন্য যেকোনো কারণ থাকলে তার বাস্তব তথ্য মাঠপর্যায় থেকেই জানতে হবে। বাস্তব চিত্র গোপন না করে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের সব বিনিয়োগের কেন্দ্রবিন্দু হবে শিক্ষার্থীর শেখা। কতটি ভবন নির্মিত হয়েছে বা কতটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুরা বিদ্যালয়ে এসে সত্যিকার অর্থে কতটুকু শিখছে।’
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিকের মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশাসনিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের প্রস্তুত করাই এই প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য।