বাসস
  ২০ মে ২০২৬, ২১:৩৪

ঝিনাইদহে পশুর হাটে ৪-৫ মণ ওজনের গরুর চাহিদা বেশি

ছবি : বাসস

শাহজাহান নবীন

ঝিনাইদহ, ২০ মে, ২০২৬ (বাসস) : ঈদুল আযহাকে ঘিরে ঝিনাইদহে কোরবানির পশুর হাটগুলো দিন দিন জমজমাট হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এর মাঝে পশু প্রস্তুত করতে বেশ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন গৃহস্থ ও খামারিরা। 

গোয়ালে থাকা গরু-ছাগলের বাড়তি পরিচর্যায় দিন পার করছেন তারা। জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট বড় খামারেও চলছে পশু মোটাতাজাকরণের শেষ সময়ের প্রচেষ্টা। ফলে গবাদিপশু বেচাকেনার হাটে বেড়েছে পর্যাপ্ত যোগান। 

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকা থেকেও হাটগুলোতে আসছেন বেপারি ও ব্যবসায়ীরা। সংগ্রহ করছেন কোরবানি উপযোগী গরু-ছাগল। এসব পশু কোরবানির জন্য সরবরাহ হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলার ছয় উপজেলায় কোরবানি উপযোগী বিপুল পরিমাণ গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলার ৬টি উপজেলায় গৃহস্থ, চাষি ও গবাদিপশুর ছোট-বড় খামারগুলোতে মোট প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৩৯৭টি গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৯৩ হাজার ৫৭২টি গরু, ১ হাজার ৩৩৪টি মহিষ, ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩০টি ছাগল ও ৯ হাজার ২৬১টি ভেড়া/গাড়ল প্রস্তুত করেছেন খামারিরা।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় ও স্থানীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর জেলায় কোরবানির জন্য প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪২০টি পশুর স্থানীয় চাহিদা রয়েছে। ফলে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পরেও জেলায় প্রায় ৫৬ হাজারেরও বেশি গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে।

উদ্বৃত্ত এসব পশু দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ শুরু হয়েছে। ঝিনাইদহ সদর ও শৈলকূপা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় পশু ব্যবসায়ী ও ঢাকাসহ অন্যান্য এলাকার বেপারিরা এরই মধ্যে হাটগুলোতে আসতে শুরু করেছেন। পছন্দমতো গবাদিপশু কিনছেন অনেকেই। বাজারে গরুর দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম। তবে ছাগল, ভেড়া ও গাড়লের দাম স্থিতিশীল রয়েছে বলে দাবি বড় ব্যবসায়ীদের।

এ ছাড়া বাজার ঘুরে স্থানীয় কোরবানি দাতারাও কিনছেন পছন্দমতো পশু। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকেই আসছেন বাজারে।

৪ থেকে ৫ মণ ওজনের গরুর দাম স্থানীয় বাজারে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বেচাকেনা হচ্ছে। অনেকেই মাংসের ওজনের হিসেবের ওপর নির্ভর করে দাম হাঁকাচ্ছেন। 

তাতে কেজি প্রতি আনুমানিক গরুর দাম প্রায় ৯০০ টাকার কাছাকাছি। তবে মাংস বিক্রেতারা একই গরু গড়ে ৭৪০ থেকে ৭৬০ টাকা কেজি হিসেবে কিনছেন। সেই হিসেবে ঝিনাইদহের পশুর হাটগুলোতে গড়ে প্রতি মণ গরুর দাম পড়ছে প্রায় ৩২ থেকে ৩৫ হাজার টাকা।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৬টি উপজেলায় ছোট-বড় মিলে অন্তত ১৫টি গবাদিপশুর হাট রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাট রয়েছে সদর উপজেলায়। তবে জেলায় গবাদিপশুর বেশ কয়েকটি বড় হাট রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া, গান্না ও বৈডাঙ্গা পশুর হাট উল্ল্যেখযোগ্য।

এছাড়া শৈলকূপা উপজেলার কাতলাগাড়ি, ভাটই বাজার, মদনডাঙ্গা পশু হাট, হরিণাকুণ্ডু উপজেলার পৌর পশু হাট, কালীগঞ্জ পৌর পশু হাট, কোটচাঁদপুর পৌর পশু হাট, মহেশপুরের খালিশপুর পশু হাট, সাফদারপুর পশু হাটে বেচাকেনা ব্যাপক হারে বেড়েছে। 

স্থানীয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের পাশাপাশি বাইরের বেপারি ও ক্রেতারাও আসছেন এসব হাটে।

তবে স্থানীয় ক্রেতা-বিক্রেতারা জানান, দূর-দূরান্তের বা বড় শহরের বেপারিরা স্থানীয় ক্রেতাদের মতো একই দামে গরু কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে পারছেন। স্থানীয় বাজারে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা বা দেড় লাখ টাকা দামের গরু ঢাকাসহ অন্যান্য শহরের হাটে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাভে বিক্রি করতে পারছেন বেপারিরা। ফলে একই গরুর দাম স্থানীয় বাজারের তুলনায় শহরের বাজারে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেশি হচ্ছে।

আলতাফ হোসেন নামে স্থানীয় এক ক্রেতা বাসসকে বলেন, আমি কোরবানির জন্য নিজেই পশু কিনতে বাজারে এসেছি। গতবারও নিজে দেখেশুনে কিনেছিলাম। কোরবানির জন্য পশুর দাম-দর কিছুটা বাড়তি থাকে। ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি দাম দিয়েও গরু কিনতে হয়। বেপারিরা আমাদের চেয়ে কম দামে কিনতে পারেন।

আজিজুর রহমান নামে অপর এক স্থানীয় ক্রেতা বলেন, বাজারে মাঝারি আকারের গরুর যোগান বেশি। ৪ মণ থেকে সাড়ে ৫ মণ ওজনের গরুর চাহিদা বাড়ছে। এই ওজনের গরুর দাম ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজারের মধ্যে কেনা যায়। বড় গরু স্থানীয় লোকজন কোরবানি দিতে চায় না।

সদর উপজেলার বৈডাঙ্গা পশুর হাটের ক্রেতা সেলিম বেপারি বলেন, গরুর ঘাস, খড়, ভূষিসহ অন্যান্য খাদ্যের দাম বেড়েছে। যে কারণে গ্রাম থেকে গরু কিনতে গেলেও দাম বেশি পড়ছে। হাটে বাইরের বেপারিরা এসে খুব একটা বেশি দাম এবার দিচ্ছে না। 

মাঝারি গরু ছাড়া বড় গরুর বেচাকেনা কম। ৪ থেকে ৫ মণ ওজনের গরুর চাহিদা বাজারে সবচেয়ে বেশি।

গো-খামারি রায়হান হাসান জানান, পশুখাদ্যের দাম আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। কোরবানি সামনে রেখে পশুর স্বাস্থ্য ও পরিচর্যায় বিশেষ নজর দিতে হচ্ছে। বাড়তি খাবার দিতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু বাজারে দাম সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।

সদর উপজেলার হলিধানী বাজারের মাংস বিক্রেতা তুষার হোসেন বলেন, কোরবানির বাজারে পশুর দাম অনেক বেড়েছে। যারা কোরবানি দেন, তারা তো গরুর মান ও সৌন্দর্য্য দেখেন। যে কারণে দাম কিছুটা বেশি পড়ে যায়। 

আমরা যারা মাংসের হিসাবে গরু কিনছি এখনকার বাজারে আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। প্রতি মণ গরুর মাংসের দাম পড়ছে প্রায় ৩২ থেকে ৩৫ হাজারের মতো। যারা কোরবানি দিচ্ছেন, তাদের মাংসের হিসাবে দাম আরও কিছুটা বাড়বে, এটা স্বাভাবিক।

ঝিনাইদহ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এএসএম আতিকুজ্জামান বাসসকে বলেন, ঝিনাইদহে গবাদিপশু পালন এখন বড় একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি। জেলায় স্থানীয় চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫৬ হাজার কোরবানি উপযোগী গবাদিপশু পশু প্রস্তুত রয়েছে।

গবাদিপশুর বাণিজ্যিক পালনের পরিসর বৃদ্ধি পাওয়ায় এর বাজার বেড়েছে। আশা করছি, এ বছর খামারিরা ভালো লাভ করতে পারবেন।