বাসস
  ২০ মে ২০২৬, ১৬:৩৩

ঈদের আগে মেহেরপুরে ব্ল্যাক বেঙ্গলের মহোৎসব

ছবি: বাসস

দিলরুবা খাতুন

মেহেরপুর, ২০ মে, ২০২৬ (বাসস) : সকাল গড়িয়ে তখনো পুরোপুরি দুপুর হয়নি। কিন্তু মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সড়কের বারাদি মোড়ে দাঁড়ালে মনে হবে গ্রামবাংলার কোনো নিস্তরঙ্গ জনপদ আচমকা উৎসবের নগরে পরিণত হয়েছে। ধুলোর ভেতর দিয়ে ট্রাক আসছে, ভ্যান আসছে, পিকআপে বাঁধা শত শত ছাগল নামছে। দূর থেকে মাঠটাকে মনে হয় নড়ছে, আসলে নড়ছে হাজার হাজার কালো শরীর। ব্ল্যাক বেঙ্গলের ঢেউ উঠেছে বারাদি হাটে।

একটি ছাগলের গলার রশি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন শুকুর আলী। তার পেছনে সারি বেঁধে আরও পঁচিশ-তিরিশটি ছাগল। তিনি হাঁটলে তারা হাঁটে, থামলে থামে। যেন মানুষের সঙ্গে প্রাণীর বহুদিনের বোঝাপড়া। শুকুর আলী হেসে বলেন, ‘এই ছাগলই আমাদের ব্যাংক। বিপদে-আপদে এইগুলো বিক্রি করেই সংসার চলে।’

মেহেরপুরে ব্ল্যাক বেঙ্গল শুধু পশু নয়, এটি এক ধরনের অর্থনীতি। এক ধরনের সংস্কৃতি। দরিদ্র পরিবারের উঠোনে বাঁশের খুঁটির পাশে বাঁধা কালো ছোট্ট ছাগলটি একদিন হয়ে ওঠে মেয়ের বিয়ের খরচ, ছেলের পড়াশোনার টাকা কিংবা বন্যার পর ঘুরে দাঁড়ানোর সম্বল। তাই গ্রাম বাংলায় বহুদিন ধরেই এর নাম ‘গরীবের গাভী’।

ঈদ সামনে এলেই সেই গরীবের গাভীকে ঘিরে জেগে ওঠে বারাদি। সপ্তাহে দু’দিন বসা এই হাট তখন আর কেবল হাট থাকে না। হয়ে ওঠে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম প্রাণি মেলার মতো এক জনারণ্য। মাঠজুড়ে চোখ যায় শুধু কালো রঙে। কোথাও ধূসর, কোথাও বাদামি ছোপ। বেশিরভাগই ছোট শিং, মাঝারি গড়নের। শান্ত স্বভাবের প্রাণি। আশ্চর্যভাবে এত হাজার ছাগলের মাঝেও খুব বেশি চিৎকার নেই। কেবল থেমে থেমে মৃদু ডাক, আর মানুষের দরদামের গলা।

এক কোণে কয়েকজন ব্যবসায়ী ছাগলের দাঁত দেখে বয়স বিচার করছেন। অন্যদিকে এক খামারি ছাগলের পিঠে হাত বুলিয়ে বলছেন, ‘এইটা কিন্তু খাঁটি ব্ল্যাক বেঙ্গল। মাংস খাইলে বুঝবেন।’

বারাদি হাটের ইতিহাসও কম পুরোনো নয়। একসময় কুষ্টিয়া অঞ্চলের কৃষকরা নদীপথ পেরিয়ে, মেঠোপথ হেঁটে এখানে ছাগল আনতেন। তখন হাট ছিল ছোট। কয়েক ডজন ছাগল নিয়ে বসত কেনাবেচা। পরে ব্ল্যাক বেঙ্গলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও। উন্নত মাংস, কম চর্বি, দ্রুত বংশবৃদ্ধি আর উৎকৃষ্ট চামড়ার জন্য এই জাতকে বিশ্বের অন্যতম সেরা বলে স্বীকৃতি দেয় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। আর সেই সঙ্গে বড় হতে থাকে বারাদি হাটও।

এখন দেশের নানা প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন এখানে। কেউ রাজশাহী থেকে, কেউ খুলনা, কেউ ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে। ট্রাকভর্তি ছাগল কিনে আবার রাতের মধ্যেই ফিরে যান।

হাটের মাঝখানে দেখা গেল একদল ভেড়া অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গলায় কোনো রশি নেই। ভেড়ার মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন দূর থেকে একটি বড় ভেড়াকে দেখিয়ে বললেন, ‘ওইডারে ধরলেই সব আইসা ঘিরে দাঁড়াইবো। ভেড়া দলছুট হয় না।’ কথাটা বলতে বলতেই সত্যি সত্যি কয়েকটি ভেড়া দৌড়ে এসে সেই বড় ভেড়ার চারপাশে জড়ো হলো। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ মুচকি হাসল। হাটে এমন ছোট ছোট দৃশ্যও যেন আলাদা আনন্দ তৈরি করে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তোফাজ্জেল হোসেন বাসস’কে জানান, এবার মেহেরপুরে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ৬৬৫টি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল। ছোট-বড় পাঁচ শতাধিক খামার ছাড়াও অসংখ্য পরিবার বাড়িতে পালন করেছে এসব পশু। প্রতিটি ছাগলের গড় দাম ২০ হাজার টাকা ধরলে কেবল এই মৌসুমেই শত কোটি টাকার বেচাকেনা হবে।

তবে অর্থনীতির হিসাবের বাইরেও বারাদি হাটের আরেকটি রূপ আছে। দুপুরের দিকে সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ে, তখন ক্লান্ত ব্যবসায়ীরা চায়ের দোকানে বসেন। কেউ বিক্রি হওয়া ছাগলের টাকা গুনছেন, কেউ আবার অবিক্রীত পশুর মাথায় হাত বুলিয়ে পরের হাটের আশায় থাকছেন। বাতাসে তখন খড়ের গন্ধ, ধুলোর গন্ধ, আর অদ্ভুত এক গ্রামীণ জীবনের উষ্ণতা।

ঈদের আগে বাংলাদেশের বহু পশুর হাটই জমে ওঠে। কিন্তু বারাদির এই হাট আলাদা। কারণ, এখানে শুধু ছাগল বিক্রি হয় না-এখানে বিক্রি হয় মানুষের শ্রম, গ্রামীণ জীবনের আশা আর বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া বিশ্বখ্যাত ব্ল্যাক বেঙ্গলের এক অনন্য গৌরবগাঁথা।