শিরোনাম

কামরুল হাসান
কুমিল্লা, ১৩ এপ্রিল ২০২৬ (বাসস): পহেলা বৈশাখকে ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী বিজয়পুরের মৃৎশিল্পীরা। কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ তৈরি করছেন সানকি, কেউ করছেন ছোটো-বড়ো দধির বাটি। কেউ তা শুকানো কিংবা পোড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
মনীষী ও পশু-পাখির প্রতিকৃতি তৈরি করছেন কুমোররা। কেউ চাঁচ দিচ্ছেন এসব শিল্পকর্মে। কেউবা আলপনা আঁকছেন, আলাদা আলাদা কক্ষে পোড়ানো ও কাঁচা মাটির পণ্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পুরুষদের পাশাপাশি সমান তালে নারীরাও এ কাজ করছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে কুমোরদের এ কর্মযজ্ঞ।
তবে গ্যাস ও এঁটেল মাটির সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় উদ্বেগে রয়েছেন কারিগররা। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হলেও প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেয়ে ঐতিহ্যবাহী শিল্প হুমকির মুখে রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে কুমিল্লা সদর (দক্ষিণ) উপজেলার বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি লিমিটেডে গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়।
মৃৎশিল্প কারিগররা জানান, মাত্র ১৫ জন সদস্য নিয়ে ১৯৬১ সালে প্রগতি সংঘের নামে শুরু হয় এ মৃৎশিল্পের কার্যক্রম। শুরুতে জনপ্রতি এক টাকায় একটি শেয়ার এবং ৫০ পয়সা আমানত রেখে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরে এ দেশের সমবায় আন্দোলনের পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবিজ্ঞানী, প্রয়াত ড. আখতার হামিদ খানের উদ্যোগে বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতির নামকরণ করা হয়। ২২ টাকা ৫০ পয়সা মূলধন নিয়ে শুরু হয় তাদের পথচলা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতিটি ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে সরকারের পক্ষ থেকে ৭৫ হাজার টাকা আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়। এরপর পুনরায় ঘুরে দাঁড়ায় এ সমবায় সমিতি। বর্তমানে সমিতির সদস্য সংখ্যা ২৫০ জন। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা।
স্থানীয়রা জানান, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার উত্তর বিজয়পুর, দক্ষিণ বিজয়পুর, তেগুরিয়াপাড়া, গাংকুল, বারোপাড়া, দুর্গাপুর ও নোয়াপাড়া গ্রামের আট শতাধিক পাল ও কুমোর সম্প্রদায়ের মানুষ মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করতেন শত বছর ধরে। বর্তমানে এ কাজ করছে প্রায় শতাধিক পরিবার। বিজয়পুরের মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা ও সুনাম দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছেছে।
মৃৎশিল্পী সুমন চন্দ্র পাল বলেন, পহেলা বৈশাখ উৎসব সার্বজনীন। এ উৎসবের বাকি আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। দিনটিকে কেন্দ্র করে শহর-গ্রামে মেলাসহ বিভিন্ন উৎসব আয়োজন করা হয়। সেখানে মাটির হাঁস-মুরগি, হাতি-ঘোড়া, মাছ কিংবা পশুপাখি, মাটির ব্যাংক, মগ ও গ্যাসের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এছাড়াও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবার পান্তা ইলিশের জন্য সানকি এবং দই-চিড়ার জন্য ছোটো-বড়ো মাটির দধির বাটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে আমরা এসব পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছি।
দধির বাটি তৈরির কারিগর শিল্পী চক্রবর্তী বলেন, গত ৫ বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করি। বেতন পাই মাত্র ৬ হাজার ৫০০ টাকা। এ টাকা দিয়ে ছেলের পড়ালেখা ও পরিবারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়।
বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি দ্বীপক চন্দ্র পাল বলেন, ১৯৯১ সালে সরকারি খরচে আমাদের এককভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওই সংযোগ থেকে আবাসিক ও অবৈধ সংযোগ যুক্ত করায় ২০১৭ সালের পর থেকে আমাদের গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বাখরাবাদ কর্তৃপক্ষকে বহুবার লিখিতভাবে জানানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বাধ্য হয়ে আমরা এখন সনাতন পদ্ধতিতে পণ্য উৎপাদন করছি। এতে আমাদের সময় ও খরচ উভয় বেড়েছে। আর্থিক ক্ষতিরও সম্মুখীন হচ্ছি।
তিনি জানান, বিজয়পুরের পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে জাপান, মালয়েশিয়া, কাতার ও আবুধাবি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক মালের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।
দ্বীপক পাল বলেন, বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠানে ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। কিন্তু মাটি ও গ্যাস সংকটের কারণে এসব পণ্য তৈরিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। কারিগরদের উপযুক্ত বেতন-ভাতাও দিতে পারছি না। গ্যাস সংযোগ চালু হলে আমাদের এ সংকট কেটে যাবে। এ বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
তিনি বলেন, যে-কোনো মাটি দিয়ে পণ্য তৈরি করা যায় না। আবার মাটির সন্ধান পেলেও প্রশাসনের কড়াকড়িতে মাটি সংগ্রহ করা যায় না।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, আমরা চাই কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়াই যেন মাটি সংগ্রহ করতে পারি। এতে করে বিজয়পুর মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। অন্যথায় আস্তে আস্তে সংকুচিত হয়ে আসবে এই ব্যবসার ক্ষেত্র।
কুমিল্লা সদর (দক্ষিণ) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজন চন্দ্র রায় বলেন, মৃৎশিল্পীদের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে জেলা প্রশাসককে (ডিসি) অবগত করায় মৃৎশিল্প এলাকা পরিদর্শন করেছি। তাদের দাবি অনুযায়ী আমরা সেখানে একটি আধুনিক বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। তা ছাড়া গ্যাসসহ অন্যান্য সমস্যা সামাধানের বিষয়ে পর্যায়ক্রমে কাজ করা হবে।
তিনি বলেন, মৃৎশিল্প আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। আমরা কোনোভাবেই মৃৎশিল্পকে হারাতে চাই না।