শিরোনাম

মো. মামুন ইসলাম
রংপুর, ৭ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : ফসলের বাম্পার ফলন ও উৎপাদিত পণ্যের ভালো বাজারমূল্যের কারণে রংপুর অঞ্চলের নদীতীরবর্তী চরাঞ্চলে যেনো আগাম ঈদের আমেজ বইতে শুরু করেছে। চরের বাসিন্দারা এখন ঈদ-উল-ফিতরকে সামনে রেখে পরিবারের জন্য পোশাক ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
রংপুর বিভাগের রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার নদীসংলগ্ন বালুকাময় চরাঞ্চলের বাসিন্দারা একদিকে যেমন চাষ করা ফসল সংগ্রহ করছেন, অন্যদিকে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আসন্ন ঈদ-উল-ফিতর উদযাপনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।
চলতি মৌসুমে চরাঞ্চলে বিভিন্ন ফসলের বাম্পার ফলন, উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ায় চরের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
এর ফলে তারা নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যেই ঈদের কেনাকাটা করতে পারছেন।
একসময় চরের মানুষের জীবন ছিল চরম দারিদ্র্য ও নানা সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত। বাল্যবিবাহ, যৌতুক, কুসংস্কার, অপুষ্টি, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাব তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চরাঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমানে চরাঞ্চলের মানুষ কৃষিকাজ, পশুপালন এবং অন্যান্য আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভালো আয় করছেন। ফলে উৎসবমুখর পরিবেশে তারা আসন্ন ঈদ-উল-ফিতর উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রংপুরভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘নর্থ বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’র চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ শামসুজ্জামান বাসসকে বলেন, প্রতিকূল জলবায়ু ও ভৌগোলিক পরিবেশে বসবাস করলেও চরাঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড এবং প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর চর জমিতে ফসল চাষের ফলে রংপুর অঞ্চলের চরবাসীর জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে।
ফলস্বরূপ, চরাঞ্চলে ঈদের পরিবেশ বিরাজ করছে। অনেকেই ঈদকে সামনে রেখে পোশাকসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনছেন। সেখানে স্থানীয় মানুষ অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং উন্নত জীবিকা অর্জন করতে শুরু করেছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারী সংস্থার সহায়তা এবং ফসল চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সামাজিক অভিশাপও দূর করেছে।
এসব উদ্যোগের ফলে চরাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার চর তালুক শাহবাজ গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে তিস্তা নদীর শুকিয়ে যাওয়া তলদেশের চর জমিতে চাষ করা ফসল থেকে তিনি বাম্পার ফলন পেয়েছেন। তিনি বলেন, আমি চীনাবাদাম, কুমড়া, পেঁয়াজ, রসুন ও বিভিন্ন শাকসবজির ভালো ফলন পেয়েছি। বাজারদরও ভালো। তাই সন্তানদের জন্য ঈদের পোশাকসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পেরেছি।
গঙ্গাচড়া উপজেলার চর পূর্ব মহীপুর গ্রামের শাহিনুর ইসলাম ও তার স্ত্রী ফ্যান্সি বেগম জানান, তারা তিস্তার শুকনো চর জমির আড়াই একর জমিতে খিরা, আলু, কাঁচা মরিচসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করেছেন। এই দম্পতি জানান, ইতোমধ্যে তারা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকার খিরা, আলু ও অন্যান্য ফসল বিক্রি করেছেন। মে মাসের মধ্যে সব ফসল বিক্রি শেষ হলে খরচ বাদ দিয়ে প্রায় আড়াই লাখ টাকা নিট মুনাফা পাওয়ার আশা করছেন। শাহিনুর ইসলাম বলেন, আমরা ইতোমধ্যে সন্তানদের জন্য ঈদের পোশাক ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে ফেলেছি।
গঙ্গাচড়া উপজেলার পশ্চিম মহিপুর গ্রামের চরবাসী আব্দুল জলিল, মহসিন আলী, নুর ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, মকবুল হোসেন ও কফিল উদ্দিন জানান, ফসল বিক্রির অর্থ দিয়ে তারা পরিবারের সদস্যদের জন্য ঈদের পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার পরিকল্পনা করছেন।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) বুড়িরহাট উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্রের উপ-পরিচালক ড. মো. আবু সায়েম বলেন, প্রতি বছরই রংপুর অঞ্চলের চরাঞ্চলে কৃষকেরা বিভিন্ন ফসল চাষ করে ভালো লাভবান হচ্ছেন। তিনি বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ এখন ফসল সংগ্রহ ও ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। সেখানে ইতোমধ্যে ঈদের উৎসবমুখর আমেজ তৈরি হয়েছে।