বাসস
  ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:১০
আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৭

আধিপত্যবাদ, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে জনগণ একাট্টা হয়েছে : শফিকুর রহমান

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান শুক্রবার কুমিল্লায় ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। ছবি: বাসস

ঢাকা, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সমগ্র বাংলাদেশ ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে। আধিপত্যবাদবিরোধী, চাঁদাবাজবিরোধী, দুর্নীতিবাজবিরোধী মামলাবাজবিরোধী একটি সমাজ বিনির্মাণের জন্য জনগণ আজ একাট্টা হয়েছে।

আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় লাকসাম স্টেডিয়াম মাঠে কুমিল্লা-৯ আসনে সংসদ সদস্যপ্রার্থী ড. ছৈয়দ এ কে এম সরওয়ার উদ্দীন ছিদ্দীকির সভাপতিত্বে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, সারাদেশে গণজোয়ার শুরু হওয়ায় অনেকে দিশেহারা। এখন তারা মায়ের গায়ে হাত দেয়, বেইজ্জত করে। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি-আমাদের জীবনের চাইতে আমাদের মায়েদের ইজ্জতের মর্যাদা অনেক বেশি। মায়েদের গায়ে হাত দেবেন-আমরা ছেড়ে কথা বলবো না।

জামায়াত আমির বলেন, এ দেশ মুসলমান, হিন্দু-বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের। আমরা মিলেমিশে ফুলের বাগানের মতো দেশটাকে গড়বো। সকল ধর্মের মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার পাবে, এজন্য তার লড়াই করার দরকার হবে না। কারণ সমাজে আমরা সুবিচার কায়েম করব। যোগ্যতা অনুযায়ী সবাই দেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণ করবে। দেশ ও সরকার দেখবে না তিনি কোনো ধর্মের বা গোত্রের। দেখবে তিনি যোগ্য ও দেশপ্রেমিক কিনা।

অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গালভরা গণতন্ত্রের বুলি আওড়াবেন, আবার ফ্যাসিবাদী আচরণ করবেন, এই দুইটা একসাথে যায় না, এটি গণতন্ত্র নয়। অন্যের কথা শুনতে হবে, যেমন নিজের কথা বলার অধিকার আছে।

উপস্থিত জনতার উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা কি চান বাংলাদেশে আবার ফ্যাসিবাদ ফিরে আসুক? ৫ তারিখের পট পরিবর্তনের পর যারা জুলাই মানে না, যারা সংস্কার মানে না, যারা চরিত্র পাল্টায়নি- তাদের দিয়ে কি নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব? জনতা সমস্বরে না বলে উত্তর দেয়।

তিনি আরও বলেন, ১৩ ফেব্রুয়ারি নতুন বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য ১৮ কোটি মানুষ মুখিয়ে আছে। যারা জাতির সাথে এখনি ফ্যাসিবাদের আচরণ করে চলছে, তাদের দিয়ে কি ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়া যাবে? যাবে না, বলেন তিনি।

জামায়াত আমির বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস যাদের আছে তাদের বেছে নিতে হবে। এ সাহস জামায়াতে ইসলামীর আছে।

তিনি বলেন, দফায় দফায় মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মিথ্যা অভিযোগে, সাজানো সাক্ষী, পাতানো আদালত দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। জামায়াত কারো কাছে মাথানত করেনি। কারো দয়া ও অনুকম্পা কামনা করেনি। হাজার নেতাকর্মীকে হারিয়েও মাথানত করেনি। চোখ রাঙানিকে পরোয়া করেনি। দেশ ছেড়েও পালায়নি। ছিলাম, আছি, থাকবো।

তিনি বলেন, এ দেশ আমাদের ঠিকানা। আমাদের কোনো মামা-খালুর দেশ ও বেগমপাড়া নেই। আমাদের পাড়া একটাই-গর্বের বাংলাদেশ।

অন্য রাজনৈতিক নেতাদের দেশের প্রতি আস্থার সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, অন্য নেতারা হাঁচি কাশি হলেও চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, দেশের প্রতি তাদের আস্থা নেই।

অথচ তারাই একসময় এ দেশ শাসন করেছেন। সেই জায়গাটা গড়েননি কেন- প্রশ্ন রাখেন জামায়াত আমির। হাঁচি কাশির জন্য বিদেশে যেতে হয় কেন, কেন এ দেশের ওপর আস্থা নেই তাদের। কারণ, এ দেশটি তাদের টাকা বানানোর মেশিন-বলে অভিযোগ করেন ডা. শফিকুর রহমান।

অসৎ নেতাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, জনগণের টাকা হাতিয়ে নেবেন, লুণ্ঠন করবেন, ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ারবাজার লুণ্ঠন করবেন তার পর সমস্ত টাকা বিদেশে পাচার করে দেবেন। নিজের ছেলে মেয়েদের বিদেশে লেখাপড়া করাবেন। দেশের ছেলে মেয়েদের অবজ্ঞা করে নিজের সন্তানদের বিদেশি ছেলে-মেয়েদের সাথে বিয়ে দেয়ার সমালোচনাও করেন তিনি ।

জামায়াত আমির বলেন, দেশপ্রেমিকের অভিনয় করার ভন্ডামি আর দেখতে চাই না। দেশপ্রেমিকের পরিচয় দিতে হলে বাস্তবে দিতে হবে, মুখে নয়। মুখের কথা জনগণ এখন আর বিশ্বাস করে না। যারা বাস্তবে জনগণের পাশে ছিল তাদেরকেই জনগণ বেছে নেবে, পাশে দাঁড়াবে।

ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ঘরে ঘরে ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হচ্ছে। কোনো জায়গায় এটির মূল্য ২ হাজার কোনো জায়গায় ৭ হাজার। এটি দেয়া হবে মায়ের হাতে। এক হাতে ফ্যামিলি কার্ড আরেক হাতে মায়ের গায়ে হাত। বাংলাদেশের মানুষ এতো বোকা নয়, সবাই নিজের বুঝটি ভালো বোঝেন।

তিনি বলেন, মায়েরা খোলাখুলি বলে, তারা অনিরাপদ বাংলাদেশ দেখতে চান না, তারা একটি নিরাপদ বাংলাদেশ চায়। আমরা বিশ্বাস করি দাঁড়িপাল্লা ও তার সঙ্গীরাই নিরাপত্তা দিতে পারবে। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মায়েরা ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যকে বেছে নেয়ার জন্য তাদের (বিরোধীদের) কলিজায় আগুন ধরে গেছে।

তিনি আরো বলেন, যে দামাল ছেলেরা চব্বিশে ফ্যাসিবাদের জগদ্দলকে সরিয়েছে সেই সন্তানরা ঘুমিয়ে পড়েনি। তারা এখনো জেগে আছে। আগামীতে জনগণের ভোট নিয়ে কেউ যদি অন্য কোনো চিন্তা করেন তাহলে এই যুবকরা সিংহ হয়ে গর্জন করবে। সিংহের থাবা সামাল দিতে পারবেন না, সতর্ক করেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশটা সবার। সাধারণ মানুষ, প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় যারা আছেন-আমরা বিশ্বাস করি দেশ আমাদের সবার। সবার দায় আছে। সম্মিলিত প্রয়াসে আমরা একটি সভ্য দেশ গড়তে পারব।

তিনি বলেন, এদেশকে এখনো সভ্য বলা যাবে না। যে দেশে মাঠে, ঘাটে, পথে-প্রান্তরে সর্বত্র চাঁদাবাজি হয় সে দেশ কখনো সভ্য দেশ হতে পারে না। চাঁদাবাজদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের খাদ্যের অভাব হলে আমাদের খাদ্য ভাগাভাগি করে খাবো। চাঁদাবাজি ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

যুবকদের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যুবকদের বেকারভাতা দিয়ে অসম্মান করতে চাই না। যুবকরা বেকারভাতার জন্য লড়াই করেনি। তারা লড়াই করেছে মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়ার জন্য। যুবকদের হাতকে দেশ গড়ার কারিগর বানানো হবে, বলেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যে বেতন দেয়া হয় তা দিয়ে সম্মানের সাথে চলা কঠিন। এ জন্য অনেকে বাধ্য হয়ে অবৈধ আয় করেন। আমরা তাদের সম্মানের বেতন স্কেল তুলে দেবো।

তিনি আরো বলেন, গর্ভবতী মা, শিশুরা পাঁচ বছর পর্যন্ত বিনামূলে চিকিৎসা সেবা পাবেন। সচ্ছল কোনো পরিবার না নিতে চাইলে তাদের ধন্যবাদ দেবো। অবসরগ্রহণকারী জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার দায়িত্ব দেশ ও রাষ্ট্র নেবে। তবে এ ক্ষেত্রে যারা সচ্ছল তারা না নিলে অভিনন্দন পাবেন। যাদের প্রয়োজন তাদের পাওনা নিশ্চিত করা হবে।

জামায়াত আমির বলেন, প্রত্যেক জেলায় একটি করে মানসম্মত মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা হবে। এতে ৫০০ শয্যা থাকবে। প্রত্যেকটি জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে। সেখান থেকে মানুষ ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। মানুষ মিনিমাম ও ম্যাক্সিমাম সেবা পাবেন।

লাকসামের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, লাকসাম জংসনকে আধুনিক করা হবে। ন্যায্যতার ভিত্তিতে পাওনা পৌঁছে দেয়া হবে। পরিশেষে কুমিল্লা-৯ আসনের প্রার্থী ড. ছৈয়দ এ কে এম সরওয়ার উদ্দীন ছিদ্দীক ও কুমিল্লা-১০ আসনে ১১ দলীয় প্রার্থী মাওলানা ইয়াছিন আরাফাতের হাতে ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপালা তুলে দেন। 

বক্তব্যের শুরুতে জামায়াত আমির আয়নাঘরের দুঃসহ যন্ত্রণা, গুম হওয়া ও চব্বিশের শহীদানদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী সরকারের হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়াদের শহীদের মর্যাদা কামনা করেন। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আহত ও পঙ্গু হওয়াদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে সুস্থতা কামনা ও মামলা-হামলার শিকার হওয়া মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন তিনি।

সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন  বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের। 

বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা আবদুল হালিম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক(দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা  জামায়াত আমির অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শাহজাহান। 

এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, কুমিল্লা-১০ আসনে এমপি প্রার্থী মাওলানা ইয়াছিন আরাফাত, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মুতাসিম বিল্লাহ শাহীদি প্রমুখ।