শিরোনাম

ঢাকা, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ কেবল কাগজে কালো অক্ষরে ছাপা কোনো দলিল নয়, এটি ১৬ বছরের বেশি সময়ে গুম হয়ে যাওয়া মানুষের পরিবার-পরিজনের হাহাকার এবং ২৪ এর জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের রক্তের বিনিময়ে তৈরি হয়েছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকার এই সনদের ভিত্তিতে গণভোটের পক্ষে প্রচার করতেই পারে। এটিই ভবিষ্যতের পথরেখা।
আজ শনিবার রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে ‘গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে বিভাগীয় মতবিনিময় সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘এই সনদ তৈরি হয়েছে ১৬ বছরের বেশি সময়ে গুম হয়ে যাওয়া মানুষের পরিবার-পরিজনের হাহাকার থেকে। যে মা তার সন্তানকে হারিয়েছে, তার প্রতিদিনের যে অশ্রু, তা দিয়ে তৈরি হয়েছে এই জুলাই সনদ। তরুণ শিক্ষার্থী, ছোট ব্যবসায়ী, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ যেভাবে প্রাণ দিয়েছেন, সেই প্রাণের বিনিময়ে তৈরি হয়েছে এই সনদ।’
গণভোট প্রশ্নে সরকারের নৈতিক ও আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচার করতে পারেন কি না। সংবিধান, বিদ্যমান আইন এবং আরপিও, কোথাও এটি নিয়ে কোনো বাধা নেই। এ ছাড়া গণভোট সংক্রান্ত যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, সেখানেও কোনো বাধার বিষয় নেই। সরকার যদি কিছু প্রস্তাব করে, তবে সেই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন চাওয়া আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৭২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ৪৮টি গণভোট হয়েছে, যার অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সরকার রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটিকে সাধারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার মনে করা ভুল হবে। এই সরকারের নৈতিক ভিত্তি হলো ১৪০০ মানুষের আত্মদান এবং হাজার হাজার আহত মানুষের ত্যাগ। সরকার জুলাই জাতীয় সনদ চাপিয়ে দিচ্ছে না, বরং ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ৯ মাসের বেশি সময় ধরে আলোচনার ভিত্তিতে এটি তৈরি হয়েছে।’
গণভোটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, ‘৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে জুলাই সনদ তৈরি হলেও গণভোটের প্রয়োজন মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, সব রাজনৈতিক দল দেশের সব জনগণের পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব করে না। দলের বাইরেও বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। রাষ্ট্র সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাদের সম্মতি নেওয়াটাও জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো আইনি সুরক্ষা। এই গণভোটের মাধ্যমে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংস্কারের সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট বা ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো- ভবিষ্যতে যাতে কেউ আদালতে প্রশ্ন তুলতে না পারে যে, এই সংসদের কি সংবিধানের এত বড় সংস্কার বা সংশোধনী আনার এখতিয়ার আদৌ ছিল? জনগণ যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলে রায় দেয়, তবে সেই ক্ষমতা তারা পাবে এবং আদালত এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ প্রথম ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। এই সময়ের মধ্যে তারা জুলাই সনদের সংস্কারগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে। এরপর বাকি সময় তারা সাধারণ জাতীয় সংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।’
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ, দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকা, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, পিএসসি ও দুদক গঠন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার মতো মৌলিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে যে, এক জীবনে এক ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।’
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে যে, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হাইকোর্টের বেঞ্চ বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে বিচার পায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার বা কথা বলার সুযোগ থাকে না। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, বাজেট ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা তাদের বিবেক অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন। এতে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তারা তাদের এলাকার সমস্যাগুলো সংসদে তুলে ধরতে পারবেন।’
বক্তব্যের শুরুতে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ সোহেল রানার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘সোহেল রানা প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন ফ্যাসিবাদের অবসান। সোহেল রানার মতো ১৪০০ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তেই এই রাষ্ট্র সংস্কার ও গণভোটের আয়োজন।’
ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো. শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা) মনির হায়দার। এছাড়াও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধি ও গণমাধ্যম কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।