বাসস
  ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:০৪

জলবায়ু পরিবর্তনে উত্তরাঞ্চলে অস্বাভাবিক আবহাওয়া

ফাইল ছবি

\ মো. মামুন ইসলাম \

রংপুর, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : চলমান শীত মৌসুমে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মানুষ অস্বাভাবিক আবহাওয়ার মুখোমুখি হচ্ছে। সকালে তাপমাত্রা হঠাৎ করে অনেক কমে যাচ্ছে, আবার দুপুরে তা বেড়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে এবং উজানে একতরফাভাবে নদীর পানি প্রত্যাহারের কারণে আবহাওয়ার ধরনের দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে; এর চূড়ান্ত পরিণতি এখনো অজানা।

স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১৮ (খাদ্যনিরাপত্তা) প্রাপ্ত বিশিষ্ট কৃষিবিদ ড. এম এ মাজিদ এ প্রসঙ্গে বাসসকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমান আবহাওয়ার ধারা অদ্ভুত ও অনিশ্চিত আচরণ করছে, যা কৃষিসহ সব খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বছরের পর বছর ধরে দিন ও রাতের গড় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। এতে জলবায়ুর ধরনে এক ধরনের অস্বাভাবিকতা তৈরি হচ্ছে এবং শীতে তীব্র শীত বা গ্রীষ্মে প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হচ্ছে।

উজানে আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদীগুলো থেকে অব্যাহত ও একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাচ্ছে এবং কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি বলেন, পাঁচ-ছয় দশক আগের মতো যদি প্রধান নদী ও উপনদীগুলোতে সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন পানি প্রবাহ থাকত এবং অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর কমে না যেত, তাহলে আবহাওয়ার পরিস্থিতি ভিন্ন ও আরও অনুকূল হতে পারত।

‘পরিবর্তিত জলবায়ুতে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে আমাদের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবনে বাধ্য হতে হয়েছে। কিন্তু এখন মানুষের টিকে থাকার জন্য শীত ও তাপ-সহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবনের সময় এসেছে,’ তিনি বলেন।

পরিবেশবিদ ও ‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিন্ন নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহারের কারণে উত্তরাঞ্চল এক অদ্ভুত জলবায়ু পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।

ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, যমুনা, করতোয়া, আত্রাই, যমুনেশ্বরী, পুনর্ভবা এবং আরও বহু নদী জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে উজানে দশকের পর দশক ধরে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে শুকিয়ে যাচ্ছে এবং নদীর তলদেশ পলিতে ভরে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে তিস্তা নদী শুকিয়ে গেছে, যা উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা, পাশাপাশি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।’

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের পিএইচডি ফেলো পরিবেশবিদ মো. মামুনুর রশিদ বাসসকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে কথা বলেন।

তিনি বলেন, পরিবর্তিত জলবায়ু ইতোমধ্যে কৃষি, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ, আবহাওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, জনস্বাস্থ্য ও বসবাসের ক্ষেত্রে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, তীব্র শীত ও তাপ, সমুদ্র ও ভূ-পৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি, পানি দূষণ, পানি ও মাটির লবণাক্ততা, জলজ ব্যবস্থার অবক্ষয়, নদীতে পলি জমা, নদী শুকিয়ে যাওয়া ও ভাঙন ঘটছে,’ তিনি বলেন।

গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নর্থ বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ সামসুজ্জামান অস্বাভাবিক হারে নদীর তলদেশে পলি জমে অকাল বন্যা ও ভাঙন সৃষ্টি এবং আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশে বিভিন্ন ফসল চাষ মৌসুমের ধরন ইতোমধ্যে বদলে গেছে, যা কৃষি খাতে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

‘সামগ্রিক জলবায়ু ধরনে ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে মৌসুমি বৃষ্টিপাত, বন্যা, শুষ্ক মৌসুম, বীজ ও চারা বপন বা রোপণের সময় এবং ফসল কাটার সময় মারাত্মকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে,’ তিনি যোগ করেন।

স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তরাঞ্চলে ভোর থেকে তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এ সময় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।

তবে দুপুরে সূর্যের দেখা মিললে আবহাওয়ার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়ে ২২ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উপ-হিমালয়ীয় উত্তরাঞ্চলে আবহাওয়ার উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের সূত্র অনুযায়ী, শনিবার অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ থেকে ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৬ দশমিক ৫ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।