শিরোনাম

ময়মনসিংহ (বাকৃবি), ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস): খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উন্নয়নের লক্ষে ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট ব্রহ্মপুত্রের কোলঘেঁষে ১২শ একর জমির ওপর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) যাত্রা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মধ্যেই যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি ফার্ম। দীর্ঘ এই পথচলায় আধুনিকায়নের ছোঁয়ায় ফার্মটি আজ একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা, গবেষণা ও উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৭০ একর বিস্তৃত এই ফার্মে পশুপালন ও চাষাবাদের এক অনন্য সমন্বয় গড়ে উঠেছে। গবেষণার পাশাপাশি দেশের দুগ্ধ উৎপাদনেও বিশেষ ভূমিকা রাখছে এ ডেইরি ফার্মটি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়টি (বাকৃবি) প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নান্দনিক স্থাপত্যে সমৃদ্ধ। এ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাঙ্গন নয়। দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ গবেষণার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। শিক্ষা ও গবেষণায় বিশেষ অবদান রেখে চলেছে বাকৃবির এ ডেইরি ফার্ম। যা দীর্ঘদিন ধরে প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এ ফার্মটিতে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
বাকৃবির ডেইরি ফার্ম সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ফার্মটিতে মোট ২৭০টি গবাদিপশু রয়েছে। এর মধ্যে ৭০টি দুগ্ধদানকারী গাভী, ১২০টি বাছুর, ৩১টি প্রজনন বিশ্রামে থাকা গাভী এবং ৪৯টি মহিষ অন্তর্ভুক্ত। এ ফার্মে হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান, জার্সি, শাহিওয়াল ও রেড চিটাগাং জাতের উন্নত গাভী এবং মুর্রাহ, নিলি-রাভি ও দেশি জাতের মহিষ পালন করা হচ্ছে।
এ ডেইরি ফার্ম থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৮০ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। বছরে প্রায় নব্বই হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হয়। এর একটি অংশ বাছুরের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং অবশিষ্ট দুধ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও আশপাশের এলাকায় কেজি প্রতি ৭৫ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। এছাড়া উৎপাদিত দুধ থেকে উন্নতমানের দই, পনির ও ঘিসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করা হচ্ছে। যা স্বাদ ও গুণমানে সুপরিচিত।
বর্তমানে এ ডেইরি ফার্মের দায়িত্ব পালন করছেন, ডেইরি বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাদাকাতুল বারি।
ডেইরি সায়েন্স বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা এখানে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করছে। একই সঙ্গে দুধ উৎপাদন, পশু পুষ্টি, প্রজনন ও রোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নানা গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাই শুধু উৎপাদন নয়, শিক্ষা ও গবেষণা এ ফার্মের মূল শক্তি।
ডেইরি ফার্ম সূত্রে আরো জানায়, প্রাণিস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফার্মে নিয়মিত টিকাদান ও কৃমিনাশক কর্মসূচি চালু রয়েছে। অ্যানথ্রাক্স, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ, এলএসডি ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি উন্নতমানের খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ও উৎপাদনক্ষমতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ডেইরি সায়েন্স বিভাগের স্নাতক শিক্ষার্থী তামান্নার সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বাকৃবির ডেইরি ফার্ম আমাদের জন্য একটি বাস্তবমুখী শেখার ক্ষেত্র। ক্লাসে যে বিষয়গুলো তাত্ত্বিকভাবে শিখি এখানে এসে সেগুলো হাতে-কলমে দেখার সুযোগ পাই। গবাদিপশুর খাদ্য ব্যবস্থাপনা, দুধ উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ ও প্রজনন ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন ভবিষ্যৎ পেশাজীবনে আমাদের অনেক এগিয়ে রাখবে বলে মনে করি।
স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মো. আব্দুর রহমান বলেন, ডেইরি ফার্মটি আমাদের গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত জাতের গাভী ও মহিষের ওপর গবেষণা করার পাশাপাশি দুধের গুণগত মান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রাণিস্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি। প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও গবেষণা সহায়তা আরও বাড়ানো গেলে এখান থেকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা বেরিয়ে আসবে বলে আমি মনে করি।
ডেইরি ফার্মের নির্বাহী সদস্য ও ডেইরি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুম বাসসকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে এই ফার্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা দেশ ও বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে।
তিনি বলেন, তবে গবেষণা ও আধুনিক শিক্ষা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণে পর্যাপ্ত বাজেট ও আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন জরুরি। সব মিলিয়ে বাকৃবির ডেইরি ফার্ম শুধু দুধ উৎপাদনের কেন্দ্র নয়। এটি শিক্ষা, গবেষণা ও টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের এক সফল মডেল।