বাসস
  ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২১:০৭

চট্টগ্রামে ২২ জানুয়ারি শুরু হচ্ছে ৪৩,৭২৫ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ

ছবি : বাসস

চট্টগ্রাম, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একইসঙ্গে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বিষয়ে গণভোট সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৪৩ হাজার ৭২৫ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আগামী ২২ জানুয়ারি শুরু হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. মো. জিয়াউদ্দিন বাসস'কে জানান, নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর করতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের নির্বাচন করা হয়েছে। তবে পতিত সরকারের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোতে যারা ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ বা অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের এবার কোনো দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না। কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে তাদের অতীত ভূমিকা নির্বাচন কমিশন নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করছে, অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, নির্বাচিত প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের অতীত ভূমিকা নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে, যাতে নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যায়।

চট্টগ্রাম জেলার সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বশির আহমেদ জানিয়েছেন, দায়িত্ব পালনের জন্য ৩৯ হাজার ৭৫০ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা (প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার) লাগবে। এর সাথে অতিরিক্ত ১০ শতাংশসহ মোট ৪৩ হাজার ৭২৫ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে। এরমধ্যে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে এই প্রশিক্ষণ চলবে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ভোটগ্রহণের জন্য ১৯৬৫টি ভোটকেন্দ্র এবং ১২৫৯৫টি ভোটকক্ষ (বুথ) চূড়ান্ত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের তথ্যানুযায়ি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৭ জন এবং মহিলা ভোটার সংখ্যা ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭০ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৭০ জন। নতুন ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলায় ৯৩৮৩৭ জন মৃত ভোটার কর্তন করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের ভোটার স্থানান্তর করা হয়েছে ২৪৭৯৯ জন ভোটার। ভোটারের সংখ্যা আগের নির্বাচনের চেয়ে প্রায় ১ লাখ বেড়েছে। সে তুলনায় ভোটকেন্দ্র না বেড়ে উল্টো কমেছে। সব আসন মিলিয়ে ভোটকেন্দ্র কমেছে ৫৮টি। গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৬টি আসনের ভোটার ছিল ৬৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯২৫। ভোটগ্রহণ করা হয়েছিল ২ হাজার ২৩টি কেন্দ্রে। এবার ভোটগ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ১৯৬৫টি ভোটকেন্দ্র।

এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১ আসনে ১০৬, চট্টগ্রাম-২ আসনে ১৪১টি, চট্টগ্রাম-৩ আসনে ৮৩, চট্টগ্রাম-৪ আসনে ১২৪, চট্টগ্রাম-৫ আসনে ১৪২, চট্টগ্রাম-৬ আসনে ৯৫, চট্টগ্রাম-৭ আসনে ৯২, চট্টগ্রাম-৮ আসনে ১৭৯, চট্টগ্রাম-৯ আসনে ১২১, চট্টগ্রাম-১০ আসনে ১৩৯, চট্টগ্রাম-১১ আসনে ১৪৩, চট্টগ্রাম-১২ আসনে ১১৩, চট্টগ্রাম-১৩ আসনে ১১৮, চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ১০০টি, চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ১৫৭ ও চট্টগ্রাম-১৬ আসনে ১১২টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গতবার ইভিএমে মাধ্যমে ভোট গ্রহণ হয়েছিল। এবার হবে কাগজের ব্যালটে। ইভিএম ভোট গ্রহণ করতে হলে বেশি কেন্দ্রের প্রয়োজন হয়। যেহেতু কাগজের ব্যালটে ভোট গ্রহণ করা হবে, তাই কেন্দ্রের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবে কমেছে।

ভোটের মাঠে হিসাব-নিকাশ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন চট্টগ্রামে নির্বাচনের ফলাফলে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে যাচ্ছে প্রবাসীদের ভোট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসন থেকে দেশ ও দেশের বাইরে মিলিয়ে নিবন্ধন করেছেন ৯৫ হাজার ২৪৬ জন ভোটার। এর মধ্যে সর্বোচ্চ নিবন্ধন হয়েছে চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে এবং সবচেয়ে কম সাড়া মিলেছে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে। প্রবাসী ভোটারদের নিবন্ধন-সংক্রান্ত ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্প সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি দেশের ভেতরে তিন শ্রেণির ভোটার নিবন্ধন করেছেন। তারা হলেন- নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী এবং আইনি হেফাজতে (কারাগারে) থাকা ভোটার।

জানা যায়, চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনে নিবন্ধন করেছেন ৬ হাজার ৫৮৬ জন, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে ৭ হাজার ৬৮৯ জন, চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে ৪ হাজার ৭৯২ জন। চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড-সিটি কর্পোরেশন আংশিক) আসনে ৫ হাজার ১৪৪ জন। চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী-সিটি কর্পোরেশন আংশিক) আসনে ৬ হাজার ৭৮৫ জন, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে ৪ হাজার ৫ জন, চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়া ৫ হাজার ৮৫৩ জন, চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে ৫ হাজার ৬০৫ জন। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনে ৩ হাজার ৮৩৬ জন, চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-পাহাড়তলী ও হালিশহর) আসনে ৬ হাজার ১৪০ জন, চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে ৫ হাজার ৯৪৩ জন, চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে ৩ হাজার ২০১ জন, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে ৩ হাজার ২১৯ জন। চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে ৫ হাজার ২৮৪ জন, চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে নিবন্ধন করেছেন ১৪ হাজার ৩০১ জন, চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে ৬ হাজার ৭৬৩ জন ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন।

চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে চট্টগ্রাম জেলা সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মো. বশির আহমেদ বলেন, রুটিন অনুযায়ী নির্বাচনী কার্যক্রম চলছে, কোনো সংশয়-সন্দেহ নেই। ইনশাল্লাহ যে কোনো মূল্যে একটি উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিছু ভোটকেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে।

তিনি জানান, চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ১৪৫ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন, তার মধ্যে বাছাইয়ে ৪২জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়, এরমধ্যে আপিল শুনানি চলছে, অনেকেই আপিলে প্রার্থীতা ফিরে পেয়েছেন। ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রত্যাহার চলবে, ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ দিব, ২২ জানুয়ারি থেকে প্রচারণা শুরু হবে। ভোটগ্রহণ ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। একই দিনে বিরতিহীনভাবে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

ইতোমধ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে অনেক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। অনেকে জরিমানারও সম্মুখীন হয়েছেন। এছাড়া পোস্টাল বিডি অ্যাপসে নিবন্ধিত চট্টগ্রামের ৯৫ হাজার ২৪৬ জন ভোটারের কাছে ব্যালট পেপার প্রেরণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেও মো. বশির আহমেদ জানান।