শিরোনাম

এস এম আশিকুজ্জামান
ঢাকা, ১০ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : নাগরিকের অধিকার রক্ষার অন্যতম কার্যকর সাংবিধানিক হাতিয়ার রিট। অনেক সময় হাইকোর্টে একজন ব্যক্তির করা রিটের সুফল ভোগ করেন দেশের হাজারো মানুষ।
সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পাঁচ ধরনের রিট করার সুযোগ রয়েছে। সেগুলো হলো:
রিট অফ হেবিয়াস করপাস (Habeas Corpus) : কোনো ব্যক্তিকে আইনগত কারণ ছাড়া আটকে রাখা হলে হেবিয়াস করপাস রিট করা যায়। এক্ষেত্রে বেআইনিভাবে আটক বা গ্রেফতার ব্যক্তিকে হাজির করতে হাইকোর্ট নির্দেশ দেন।
রিট অফ ম্যান্ডামাস (Mandamus) : কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের আইন অনুযায়ী যে কাজ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা না করলে হাইকোর্ট সেই কাজ করতে নির্দেশ দেন।
রিট অফ সার্টিওরারি (Certiorari) : বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনবহির্ভূতভাবে কোনো আদেশ দিলে হাইকোর্ট সেই আদেশ বাতিল করতে পারেন।
রিট অফ প্রহিবিশন (Prohibition) : বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল যদি তাদের আইনগত ক্ষমতার বাইরে কোনো মামলা শুনতে শুরু করে, তাহলে হাইকোর্ট তাদের সেই কার্যক্রম বন্ধ করতে নির্দেশ দেন।
রিট অফ কো-ওয়ারেন্টো (Quo Warranto) : কেউ আইনগত যোগ্যতা ছাড়া কোনো সরকারি পদে থাকলে এই রিটের মাধ্যমে হাইকোর্ট তার বৈধতা যাচাই করেন।
জনস্বার্থ রিটের ঐতিহাসিক ভিত্তি : মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ মামলা থেকে মূলত জনস্বার্থ মামলার আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়। এই মামলার রায়ে বলা হয়, জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও যে-কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চেয়ে জনস্বার্থে মামলা করতে পারেন। সেই থেকে আমাদের দেশে জনস্বার্থে করা রিট মামলা ভিন্ন মাত্রা পায়।
ব্যক্তির ন্যায়বিচার প্রাপ্তি কিংবা জনস্বার্থ রক্ষায় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা রিটের সংখ্যা কম নয়। কিছু রিটের ফলে আমাদের সমাজ ও জীবনে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন।
ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন : শিশু উমাইরকে নিয়ে তার মা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসানের করা এক রিটের পর হাইকোর্ট কর্মস্থল, বিমানবন্দর, বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন, শপিংমলের মতো পাবলিক প্লেস এবং স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনে নির্দেশ দেন।
নদী পায় আইনি অধিকার : নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে করা এক রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট তুরাগ নদীসহ দেশের সব নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা (Legal Entity)’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর ফলে নদী রক্ষায় প্রশাসনিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায় এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদে নতুন আইনি ভিত্তি তৈরি হয়।
মায়ের পরিচয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তির সুযোগ : জনস্বার্থে করা এক রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট নির্দেশ দেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি ফরমে শুধু মায়ের নাম দিয়েও ভর্তি হওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। এর ফলে বিশেষ করে যাদের পিতার পরিচয় উল্লেখ করা সম্ভব নয়, তারা বৈষম্যের শিকার না হয়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়।
ক্ষতিপূরণের দৃষ্টান্ত : ওয়ার্কশপে কাজ করতে গিয়ে হাত হারানো শিশু নাঈম হাসান নাহিদ ৬ বছরের আইনি লড়াইয়ে শেষে গত ৬ জুলাই ক্ষতিপূরণের সর্বমোট ৩০ লাখ টাকা বুঝে পান। নাঈমের বাবার করা রিটের পর হাইকোর্টের রায় ও আপিল বিভাগের নির্দেশে এই ক্ষতিপূরণ মেলে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলায় পদক্ষেপ : দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে র্যাগিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের প্রতিকারে অ্যান্টি র্যাগিং কমিটি ও র্যগিং বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
অন্যদিকে, ২০০৯ সালে হাইকোর্টের এক রায়ের মাধ্যমে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই নির্দেশনা দীর্ঘদিন দেশের প্রধান নীতিমালা হিসেবে অনুসরণ করা হয়।
জরুরি চিকিৎসাসেবার নিশ্চয়তা : জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে বিভিন্ন হাসপাতালের অস্বীকৃতি জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়। সে রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট গুরুতর আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য দেশের সব হাসপাতালকে নির্দেশ দেন।
উচ্চ আদালতের রিট মামলার বাস্তবতা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সালাউদ্দিন দোলন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) কে বলেন, রিট মামলা সাংবিধানিক একটি অধিকার। জনস্বার্থের (রিট) মামলার মাধ্যমেই আদালতের হস্তক্ষেপে অনেক ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যক্তি তার আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে। তবে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে অনেকেই হাইকোর্টে রিট করেন শর্টকাট পন্থায় মিডিয়ায় পরিচিতি পাবার জন্য। এটা খুবই দু:খ জনক। এক্ষেত্রে মিডিয়া ও সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে যাতে জনস্বার্থহীন কোন বিষয়কে পুঁজি করে কেউ ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করতে না পারে। সর্বোপরি আমাদের এই সমাজ-রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই জনস্বার্থ (রিট) মামলার দ্বার উন্মুক্ত থাকা দরকার।