বাসস
  ০২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৮
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ১১:০১

ভোক্তা অধিকার আইনে অপরাধীর হয় দণ্ড, অভিযোগকারী পান জরিমানার অর্থ

এস এম আশিকুজ্জামান

ঢাকা, ২ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): খাদ্যে ভেজাল, প্রতারণা, অতিরিক্ত মূল্য আদায় কিংবা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের মতো বিষয়ের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি ভিত্তি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯। এই আইন অমান্যকারী অপরাধীকে ভোগ করতে হয় কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড। অন্যদিকে অভিযোগকারী পেতে পারেন আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ অর্থ।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৩৬ ধারায় বলা হয়েছে, অনুসন্ধান, তদন্ত বা বিচার কার্যক্রমে যদি প্রতীয়মান হয় কোনো পণ্য দৃশ্যত ভেজাল এবং মানুষের খাদ্য হিসাবে অযোগ্য বা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আর অনুরূপ অভিযোগ যদি প্রতিপক্ষ কর্তৃক অস্বীকার না করা হয়, তাহলে সে পণ্য সরাসরি আটক করে নির্ধারিত পদ্ধতিতে ব্যবহার, হস্তান্তর, ধ্বংস বা অন্য কোনো প্রকারে বিলি-বন্দোবস্ত করা যাবে।

এই আইনের ৩৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো পণ্য মোড়কাবদ্ধভাবে বিক্রি করা এবং মোড়কের গায়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, ব্যবহার-বিধি, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, প্যাকেটজাতকরণের তারিখ এবং মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করার দণ্ডের বিষয়ে এই আইনের ৩৮ ধারায় বলা হয়েছে , কোনো ব্যক্তি তার দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান কোনো স্থানে পণ্যের মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। 

আইনের ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সেবার মূল্যের তালিকা সংরক্ষণ না করলে এবং সংশ্লিষ্ট স্থানে বা সহজে দৃশ্যমান কোন স্থানে উক্ত তালিকা প্রদর্শন না করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোনো পণ্য, ঔষধ, সেবা বিক্রয় বা বিক্রয়ের প্রস্তাব করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন বলে আইনের ৪০ ধারায় স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে। আর এই আইনের ৪১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি জ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করলে বা করতে প্রস্তাব করলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এদিকে মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক কোনো দ্রব্য, যা খাদ্য পণ্যের সাথে মিশ্রণ আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হয়েছে এমন দ্রব্য খাদ্য পণ্যের সাথে মিশ্রিত করলে ৪২ ধারা অনুযায়ী ওই ব্যক্তি অনূর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। 

এছাড়া মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো প্রক্রিয়ায় (যা আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ) কোনো পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ করলে ৪৩ ধারা অনুযায়ী ওই ব্যক্তি অনূর্ধ্ব দুই বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রির উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করলে আইনের ৪৪ ধারা অনুযায়ী তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর কোনো ব্যক্তি প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রি বা সরবরাহ না করলে ৪৫ ধারা অনুযায়ী তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ওজনে কারচুপির দণ্ডের বিষয়ে আইনের ৪৬ ধারায় বলা হয়েছে , কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য সরবরাহ বা বিক্রির সময় ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনে পণ্য সরবরাহ করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। 

অন্যদিকে কোনো ব্যক্তির দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ওজন পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত বাটখারা বা ওজন পরিমাপক যন্ত্র প্রকৃত ওজন অপেক্ষা অতিরিক্ত ওজন প্রদর্শন করলে ওই ব্যক্তি আইনের ৪৭ ধারা অনুযায়ী অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত পরিমাপ অপেক্ষা কম পরিমাপে পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করলে ৪৮ ধারা অনুযায়ী অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। 

দৈর্ঘ্য পরিমাপের কাজে ব্যবহৃত পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছুতে কারচুপি করা হলে ৪৯ ধারা অনুযায়ী তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্যের নকল প্রস্তুত বা উৎপাদন করলে ৫০ ধারা অনুযায়ী অনূর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর মেয়াদ উত্তীর্ণ কোনো পণ্য বা ঔষধ বিক্রি করলে বা করতে প্রস্তাব করলে ৫১ ধারায় অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এই আইনের ৫২ ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত বিধি-নিষেধ অমান্য করে সেবা গ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে এমন কোনো কাজ করলে অনূর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর ৫৩ ধারায় বলছে, কোনো সেবা প্রদানকারী অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতা দ্বারা সেবা গ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানী ঘটালে তিনি অনূর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদণ্ড, বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের দণ্ডের বিষয়ে এই আইনের ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে , কোনো ব্যক্তি, ব্যবসায়ী বা সেবা প্রদানকারীকে হয়রানি বা জনসমক্ষে হেয় করা বা তার ব্যবসায়িক ক্ষতি সাধনের অভিপ্রায়ে মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করলে উক্ত ব্যক্তি অনুর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর এই আইনের কোনো অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি যদি পুনরায় একই অপরাধ করেন, তাহলে ৫৫ ধারা অনুযায়ী তিনি ওই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যে দণ্ড রয়েছে তার দ্বিগুণ দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। আর পূর্ববর্তী ধারাসমূহে বর্ণিত দণ্ডের অতিরিক্ত আদালত যথাযথ মনে করলে অপরাধের সংশ্লিষ্ট অবৈধ পণ্য বা পণ্য প্রস্তুতের উপাদান-সামগ্রী রাষ্ট্রের অনুকূলে ৫৬ ধারা অনুযায়ী বাজেয়াপ্তের আদেশ দিতে পারবেন।

এই আইনের ৭৬ ধারায় বলা হয়েছে, ভোক্তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আরোপিত জরিমানার আদায়কৃত অর্থের ২৫ শতাংশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগকারীকে প্রদান করতে হবে। তবে অভিযোগকারী অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী হলে তিনি আদায়কৃত অর্থের ২৫ শতাংশের প্রাপ্য হবেন না। অন্যদিকে, এই ধারার অধীন আদালতে বা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নিয়মিত ফৌজদারী মামলায় অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করা হলে এবং জরিমানার অর্থ আদায় করা হলে তার ২৫ শতাংশ অর্থ অভিযোগকারীকে প্রদান করতে হবে। তবে অভিযোগকারী অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী হলে তিনি আদায়কৃত অর্থের ২৫ শতাংশের পাবেন না।

তবে আইনের ৭৭ ধারায় বলা হয়েছে, সরল বিশ্বাসে কৃত কোনো কাজের ফলে কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা তার ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা থাকলে তার জন্য সরকার, পরিষদ, পরিষদের কোনো সদস্য, অধিদপ্তর, অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানী বা ফৌজদারী মামলা বা অন্য কোনো আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। এদিকে অপরাধের দায় হতে অব্যাহতির বিষয়ে এই আইনের ৭৮ ধারায় বলা হয়েছে , এই আইনের কোনো বিধানের লঙ্ঘনজনিত কোনো কাজের সাথে কোনো বিক্রেতার জ্ঞাতসারে সংশ্লিষ্টতা না থাকলে, তাকে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধের জন্য দায়ী করে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।

গুরুত্বপূর্ণ এই আইন ও ভোক্তা অধিকারের বাস্তবতা প্রসঙ্গে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী বাসস’কে বলেন, ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ বাংলাদেশের ভোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে আইনটির পূর্ণ সুফল নিশ্চিত করতে হলে কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’