বাসস
  ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৩৪
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৪:১২

চোখ হারিয়েও স্বপ্ন দেখেন শুভ, চান যোগ্যতা অনুযায়ী পুনর্বাসন

ছবি : বাসস

রেদওয়ান আহমদ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ২ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : চোখের আলো নিভে গেছে। তবুও নেভেনি আশার আলো। 

ভবিষ্যতে পুলিশ ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন ছিল যে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের, সেই শুভ মাহমুদ এখন আহত জুলাই যোদ্ধা। 

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে ডান চোখ হারালেও মানসিক শক্তি এখনও অটুট তার।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র শুভর বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায়। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বিকেলে মুরাদপুর এলাকায় আন্দোলনের সময় তার ডান চোখে গুলি লাগে। এতে চোখের কর্নিয়া ও রেটিনাসহ পুরো চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এরপর দু’দফা অস্ত্রোপচার করেও চোখটি রক্ষা করা যায়নি। ডাক্তার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সে আর কোনোদিন দেখতে পারবে না। তবুও স্বপ্ন দেখেন শুভ। হয়তো সৃষ্টিকর্তার কৃপায় একদিন সেই চোখে আবারও আলো ফিরে পাবেন।

১৬ জুলাইয়ের সেই ভয়াল বিকেলটা আজও প্রতিটি মুহূর্তে শুভকে তাড়া করে বেড়ায়। মুরাদপুরে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালীন গুলিবিদ্ধ হন।

‘পেছনে ঘোরার সময় হঠাৎ একটা আওয়াজ, চোখে কী যেন একটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাই আমি। আমাকে ধরতে ডাকি, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসে না’-বলছিলেন শুভ।

গুলিবিদ্ধ হয়ে চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। নিজেই বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। চোখে হালকা ঘষে দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতেও ব্যর্থ হন। পরে একটু জোরে ঘষতেই চোখ থেকে আঠালো কিছু বের হয়ে আসে। 

তিনি বুঝতে পারেন, বিপদ ভয়াবহ।

তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে যেতে চাইলেও রাস্তাগুলো পুলিশ আর ছাত্রলীগ-যুবলীগ সদস্যদের ব্যারিকেডে আটকে ছিল। 

আতঙ্কে কেউ তাকে নিতে রাজি হচ্ছিল না। শেষমেশ কয়েকজন অচেনা আহত তরুণের সঙ্গে হেঁটেই রওনা হন হাসপাতালের দিকে। পথে এক রিকশাওয়ালাকে অনেক অনুরোধ করে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে।

‘যারা সঙ্গে ছিল, তাদের সাথে আমার পরিচয় ছিল না। চমেকে যাওয়ার পর তারা তাদের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। আমি একা হয়ে পড়ি। এক হাত দিয়ে চোখের রক্ত আটকানোর চেষ্টা করছি, আরেক হাতে ধরে এগোচ্ছি। 

কয়েকজনকে বলি, ভাই, আমারে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়া যান। কথাগুলো বলতে গিয়ে শুভর গলায় কষ্ট ও কান্নার ধ্বনি যেন একসঙ্গে বেজে ওঠে।

চমেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে পাঠানো হয় ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে। বিমানে টিকিট না পাওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সে করে রাতেই রওনা দেন শুভ। সকালবেলায় পৌঁছেও সেখানেও শুরু হয় আরেক যুদ্ধ।

শুভ বলেন, ‘আমার চোখ থেকে রক্ত পড়ছে, অথচ ওরা বলছে, ভর্তি নিতে পারবে না। অনেক অনুরোধের পর ভর্তি নিলেও কোনো চেকআপ বা চিকিৎসা দেয়নি। কেবল বেডে ফেলে রাখে তারা আমাকে।’

১৭ জুলাই সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো এক ডাক্তার শুভর অস্ত্রোপচার করেন। সে সময় ডাক্তারদের কণ্ঠেও ছিল হতাশার সুর, ‘আহা, এত কম বয়সী ছেলে, আর কোনোদিন দেখতে পাবে না।’ সেদিনের সেই কথাগুলো আজও শুভর মনে গেঁথে আছে।

১৫ দিন পর ইনস্টিটিউট থেকে ছাড়পত্র পেয়ে শুভ আরেকটি চক্ষু হাসপাতালে যান। সেখানে দেড় মাস চিকিৎসা নিলে পরামর্শ দেওয়া হয় চোখটি কেটে ফেলার। নাহলে সেটি পঁচে যেতে পারে বলে আশঙ্কা জানান চিকিৎসকরা। 

কিন্তু শুভ তাতে রাজি হননি। বরং বিকল্প খুঁজতে থাকেন।

পরবর্তীতে এক টিউশন শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সহায়তায় ঢাকার সামরিক হাসপাতাল সিএমএইচ-এ ভর্তি হন শুভ। এখন পর্যন্ত সেখানেই ফলোআপ চিকিৎসা নিচ্ছেন।

শুভ জানান, ‘চোখটা ওঠা-নামা করে। কয়েক সপ্তাহ পরপর খারাপ হয়, আবার ভালো হয়। সারাজীবন ড্রপ চলবে। এক-দেড় মাস পরপর ফলোআপে থাকতে হচ্ছে। এটা দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর জন্য না, চোখটা যাতে না কাটতে হয়, সেই চেষ্টাটাই চলছে’।

তবে সুস্থ চোখটির দৃষ্টিশক্তিও একসময় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। তবে এখন অনেকটা ঝাপসা হলেও দেখতে পান। আশায় বুক বেঁধে শুভ বাসসকে বলেন, ‘আমার এখন শুধু একটাই চাওয়া, বাম চোখটা যেন ভালো থাকে’।

তবে শুধু শরীর নয়, শুভর ভেতরটাও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। চোখ হারানোর পর তিনি পড়েছিলেন পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে। মাঝে আত্মহত্যার চিন্তাও এসেছিল তার মাথায়।

যার কারণে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের অধীনে কাউন্সেলিং নিয়েছিলেন। পরে চট্টগ্রাম রেড ক্রিসেন্টের অধীনে ৮টি কাউন্সেলিং সেশন সম্পন্ন করেন।

‘চোখ হারিয়ে শুধু আলো না, হারিয়েছি অনেক কিছু। যেদিকে তাকাই, বাধা দেখি। কিন্তু এখন একটু একটু করে মানিয়ে নিচ্ছি’, মৃদু কণ্ঠে শুভ জানান।

চিকিৎসার শুরুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বা সমন্বয়করা খোঁজ নেননি বলেও অভিযোগ করেন এই জুলাই যোদ্ধা। 

পরবর্তীতে ফিরলে খোঁজ নিয়েছেন, তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী সহানুভূতি পাননি।

তবে তার বন্ধুবান্ধব আর বিভাগীয় শিক্ষকরা শুভর পাশে ছিলেন প্রতিটি ধাপে। একাডেমিক অসুবিধা এড়াতে তাকে শ্রুতিলেখক দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এই সহযোগিতাগুলো তাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায় বলে দাবি করেন শুভ।

শুভর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল পুলিশ ক্যাডার হওয়া। সেই স্বপ্নপূরণের জন্য তিনি স্বাস্থ্য সচেতন ছিলেন। 

চোখে সাবধানে ড্রপ দিতেন, অযথা কখনোই চুলকাতেন না। আজ সেই চোখই নেই।

শুভ বলেন, ‘একটা পাওয়ারফুল সানগ্লাস কেনার প্ল্যান ছিল। এখন স্বপ্নটাই নেই। তবে, আমি এখন শিক্ষক হতে চাই। যাতে ভবিষ্যতের পুলিশ ক্যাডার তৈরি করতে পারি।

রাজনীতির নামে যেসব কুকর্ম হয়, সেখান থেকে যেন শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে পারি।’

এজন্য মাস্টার্স পরীক্ষা শেষে চট্টগ্রাম ছেড়ে রাজধানী ঢাকায় চলে এসেছেন। বর্তমানে তিনি মিরপুরের একটি মেস বাসায় থাকছেন আর চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

শুভ চান, তিনি ও তার মতো আহতরা যেন প্রতিযোগিতার বাইরে না চলে যান, আবার আলাদা সুবিধাও না পান।

তিনি বলেন, ‘আমরা কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। আমাদের জন্য কোটা চালু হলে সেটা আন্দোলনের বিশ্বাসঘাতকতা হবে। আমরা চাই, যোগ্যতা অনুযায়ী পুনর্বাসন, কোটা নামক কোনো করুণা নয়।’